ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের রায় সোমবার (২৪ আগস্ট) ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট। রায়কে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নুসরাতের সোনাগাজীর বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার আপিলের রায়কে কেন্দ্র করে তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পূর্বে তাদের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সর্বদা নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে সেখানে আরও ৭ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটার কোনো শঙ্কার রয়েছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, এখন পর্যন্ত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কোনো তথ্য নেই। বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করায় নুসরাতের পরিবার স্বস্তিতে আছেন।

এদিকে আজ হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি না, নাকি সাজায় কোনো পরিবর্তন আসবে; এখন সেদিকেই নজর নুসরাতের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমরা চাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পূর্বের রায় বহাল থাকবে। হত্যায় জড়িত আসামিরা আইনের ফাঁকফোকরে কৌশলে যেন পার পেয়ে না যায়। আমাদের একটাই দাবি ন্যায়বিচার। রায়কে কেন্দ্র করে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করায় আমরা সন্তুষ্ট। তবে শঙ্কামুক্ত নই, কারণ বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হয়।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষ হয়। পরে আদালত ২৪ আগস্ট রায়ের দিন ধার্য করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে। নুসরাত হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর মোট ১৭ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নুসরাতের মা শিরীন আখতার মামলা করেন। ওই মামলায় অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মামলা তুলে নিতে নুসরাতের ওপর চাপ দেওয়া হলেও তিনি রাজি হননি। এরপর ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল এবং সেখান থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার রায়ে ১৬ আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি
মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদরাসাছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে চলতি মাসে মামলাটির শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু করে। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোছা. রোহানী সিদ্দীকা এবং আসামিপক্ষে সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও মুহাম্মদ শিশির মনির শুনানিতে অংশ নেন।
তারেক চৌধুরী/এমটিআই
