বিজ্ঞাপন

আট আনা বেতন থেকে ৮০০ টাকা, ৫৫ বছর ধরে একই হোটেলের বাবুর্চি সিরাজুল

আট আনা বেতন থেকে ৮০০ টাকা, ৫৫ বছর ধরে একই হোটেলের বাবুর্চি সিরাজুল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র উদয়ন মোড়। প্রতিদিন সকালে যেখানে চায়ের ধোঁয়া ওঠে, পরোটার সুবাস ছড়ায় আর জমে ওঠে নানা বয়সী মানুষের আড্ডা। এই পরিচিত দৃশ্যপটের পেছনের মূল রূপকার সিরাজুল ইসলাম কালু। দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ‘আলাউদ্দিন হোটেল’-এ বাবুর্চি হিসেবে কাজ করছেন তিনি। জীবনের পুরো যৌবন ও শক্তি যে রান্নাঘরে ঢেলে দিয়েছেন, বার্ধক্যে এসেও সেই অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় সুনাম ধরে রেখেছে হোটেলটি।

স্বাধীনতার ঠিক পর পর, চরম অভাব-অনটনের দিনে পেটের তাগিদে ছোট্ট বয়সে হোটেল শ্রমে যুক্ত হয়েছিলেন সিরাজুল। শুরুর দিকে কখনো পেটে-ভাতে, আবার কখনো দিনে মাত্র আট আনা বেতনে কাজ করেছেন। সময় বদলেছে, কিন্তু সিরাজুলের কর্মস্থল বদলায়নি। বর্তমানে তার দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা হলেও বয়সের ভারে আর পূর্ণ সময় বা ফুল ডিউটি করতে পারেন না। বাধ্য হয়ে অর্ধেক সময় কাজ করে পান ৪০০ টাকা। এই সামান্য উপার্জনেই কাটছে তার জীবন। এই হোটেলে কাজ করেই ছেলে-মেয়েদের মানুষ করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে বর্তমানে গ্রিল ওয়ার্কশপে কাজ করেন এবং ছোট ছেলে ভাঙড়ি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া দীর্ঘ ৫৫ বছরের কর্মজীবনে সিরাজুল ইসলাম তৈরি করেছেন বহু দক্ষ কারিগর।

হোটেলের ক্রেতা রঞ্জু বলেন, আমি আলাউদ্দিন হোটেলে ছোটবেলা থেকেই আসা যাওয়া করি। একটু সময় পেলে এখানে দুধ চা বা সামুচা খাওয়ার জন্য আসি। মাঝে মধ্যে দুপুরে লাঞ্চের জন্য আসি। এখানে খাবারের মান মোটামুটি ফাস্ট কোয়ালিটির। এই হোটেলটা আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে আরও উন্নতি করবে বলে মনে হয়।

আরেক ক্রেতা সাইদুজ্জামান বলেন, আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে দীর্ঘদিন যাবৎ যাওয়া আসা করি। মোটামুটি এই হোটেলে ১০ থেকে ১৫ বছর যাওয়া আসা আমার। খাবারের মান মুটামুটি ভালো। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে প্রবেশ করলে আমরা এই হোটেলে আসি। 

সিরাজুল ইসলামের শিষ্য আব্দুল মালেক বাবু বলেন, সিরাজুল ইসলাম খালুর সঙ্গে আমি থাকি। আমি এখানে মিষ্টির কারিগর। মিষ্টির সমস্ত রসকদম থেকে সব কিছু আমরাই করি। এখানে কাজ করে ছেলেকে ডিগ্রি পাস করিয়েছি এবং মেয়েকে রাজশাহীতে মাস্টার্স করাচ্ছি। শুরুর দিকে বেতন পেতাম ৪৬ টাকা। এখন ১১০০ টাকা বেতন পাই। এটা দিয়ে টানাটানির মধ্য দিয়েই জীবন চলছে। আমাদের বয়স হচ্ছে। আশা করি শেষ সময়ে মহাজন যেন আমাদের কিছু দেয়।

আরেক শিষ্য আব্দুর রহিম বলেন, ৯৫ সাল থেকে হেলপারি দিয়ে কাজ শুরু করি। প্রথমে ২৪ টাকা বেতন পেতাম। এখন ৮০০ টাকা বেতন পাই। আমি এখানে সিরাজুল ইসলাম কালু ওস্তাদের কাছে কাম শিখেছি। এই হোটেলের পরটা, মিস্টি, মন্ডা, ভাজা পোড়া সব আইটেম আমরা তৈরি করি। আমদের সিরাজুল ইসলাম কালু ওস্তাদ খুবই ভালো। তার কাছ থেকে শিক্ষা, দীক্ষা, কাজ কামসহ যত আইটেম আছে সব শিখেছি। এছাড়া এই হোটেলের মান যথেষ্ট ভালো। সারাদেশে এই হোটেলের ভালো সুনাম আছে।

সিরাজুল ইসলাম কালু বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি হোটেলে কাজ করি। প্রথমে বেতন আট আনা পেতাম, এছাড়া পেট ভাতও কাজ করেছি স্বাধীনের পর। সেই সময় মানুষের অনেক অভাব ছিল। এখন আমি বেতন ৮০০ টাকা পাই। কিন্ত পূর্ণ ঘণ্টা ডিউটি করতে পারি না। বয়সের কারণে অর্ধেক ডিউটি করি। তাই ৪০০ টাকা বেতন পাই। এই কাজ করে চার ছেলে মেয়েকে বড় করেছি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে গ্রিলের দোকানে কাজ করে এবং ছোট ছেলে ভাঙড়ির ব্যাবসা করে।

তিনি আরও বলেন, এই ৫৫ বছরে আমার অনেক শিষ্য তৈরি হয়েছে। তাদের অনেকে এখন কারিগর হিসেবে কাজ করে। এটা দেখে আমার ভালো লাগে। এছাড়া এই হোটেলের খাবারের মান আছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ খাবার খেতে আসে। এতে আমাদের অনেক ভালো লাগে। তাছাড়াও অসুস্থ হলে মালিক আমাদের দেখে। কিছুদিন আগে চোখের সমস্যা হয়েছিলো তখন মালিক আমাকে চিকিৎসার খরচ দিয়েছিল।

আলাউদ্দিন রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দীন বলেন, আমাদের হোটেলে দীর্ঘ দিন যাবৎ কারিগরের কাজ করেন সেরাজুল ইসলাম কালু। তিনি সততার সাথে এখানে কাজ করছেন। আমাদের কারিগরদের রান্নাবান্না অনেক ভালো। তার কাজের ধারাবাহিকতায় আমাদের হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কাস্টমারের অনেক ভিড় জমে। আমরা সব সময় মানসম্মত খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করি। এছাড়া আমাদের হোটেলে কর্মরত কারিগর ও হোটেল বয়দের বিপদ-আপদে যাথার্থভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রেজাউল করিম বলেন, সিরাজুল ইসলাম কালু এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫৫ বছর যাবৎ কাজ করে। আমাদের এই মানুষগুলো চাকরি করে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৩০ বছর আবার ৩৫ বছর কর্মরত ছিলেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ বা চাকরি করলে পেনশন ভাতা পাওয়া যায়। কিন্ত আমাদের হোটেল শ্রমিকদের জন্য সেই সিস্টেম নাই। এই সেক্টরে চাকরি শেষ করে কিছুই পাওয়া যায় না। শেষ বয়সে তাদের শরীরে যখন শক্তি থাকে না, চলতে ফিরতে পারে না। অনেকের ছেলেরাও যখন তাদেরকে দেখাশুনা করেনা। এই জীবনটা হচ্ছে খুব অবহেলিত, নিপিড়ীত ও নির্যাতিত। সে চলতে পারে না, ঔষুধ খেতে পারে না, ঔষুধ খাওয়ার পয়সা থাকে না। ছেলেরাও দেখে না। মালিক পক্ষ থেকেও কোন কিছু পাওয়া যায় না। যতক্ষণ পর্যন্ত তার দেহ চলে ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পর্ক থাকে। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য সরকারি ভাবেও কিছু পাওয়া যায় না। আমরা জেলা প্রশাসক, শ্রম অধিদপ্তর সহ অনেকেই বলেছি কিন্ত আমরা কিছু পাই না। আমরা লড়েই যাচ্ছি অনেক দিন থেকে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের একটা হোটেল মালিক সংগঠন আছে। সেটাতে মাসিক ৩০ টাকা চাঁদা তুলি। সেই চাঁদার টাকা থেকে কেউ মারা গেলে তার পরিবারকে ৮ হাজার টাক দিয়ে থাকি এবং কোন শ্রমিকের প্রথম কন্যা বিয়ের সময় ৪ হাজার টাক দিয়ে থাকি। এছাড়া কেউ অন্য কোন বিপদে পড়লে আমরা শ্রমিকরা চাঁদা তুলে তার পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করি।  

আশিক আলী/আরকে