সীমান্তের গ্রাম দুটিতে যেতে মাত্র কয়েক কিলোমিটার পথ। অথচ সেই পথ পাড়ি দিতে বর্ষায় জুতা খুলে কাঁদা মাড়াতে হয়, গাড়ি দূরে রেখে হেঁটে যেতে হয়। এমনকি রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে বিপাকে পড়েন স্বজনরা, আর কৃষক-ব্যবসায়ীদের বোঝা কাঁধে নিয়ে পাড়ি দিতে হয় এই পথ।
শুধু স্থানীয় মানুষের চলাচলই নয়, সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা কিংবা যেকোনো জরুরি নিরাপত্তা সংকটের মুহূর্তে এই সড়ক দিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে পারেন না বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এমন দুর্ভোগের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা কদমতলী মোড় থেকে রামকৃষ্ণপুর ও কল্যাণপুর হয়ে পাঁচবিবি উপজেলার লকমা জমিদার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক। পিচঢালাই না থাকায় বর্ষায় কাদা-পানি আর খরায় ধুলাবালুতে চলতে হয়। দীর্ঘদিনেও পাকাকরণ না হওয়ায় রাস্তাটি এখন স্থানীয়দের কাছে যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে দুর্ভোগের কারণ এবং উন্নয়নের মানচিত্রের বাইরে পড়ে থাকা এক জনপদের দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্রামবাসীরা জানান, সড়কটি দিয়ে চলাচল করা পশ্চিম রামকৃষ্ণপুর ও কল্যাণপুর গ্রাম দুটি পুরোটাই সীমান্তরেখা ঘেঁষে বিস্তৃত। শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে অসুস্থ রোগী ও প্রসূতি নারীদের এই পথ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কটি চলাচলের পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জরুরি প্রয়োজনেও অনেক সময় যানবাহন পাওয়া যায় না। ফলে রোগীকে কাঁধে করে কিংবা হেঁটে মূল সড়কে নিয়ে যেতে হয়। সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি টহল দলের সার্বক্ষণিক ও দ্রুতগতিতে যাতায়াতও কষ্টকর হয়েছে।
পশ্চিম রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই রাস্তা-ঘাটে যাবা (যাওয়া) খুব সমস্যা। মানে পানি হলে পরে তো যাবাই পারবেন না। গাড়ি ওইপাড় থুয়ে (রেখে) আসা লাগে, আবার এইপাড় থুয়ে বাড়ি যাওয়া লাগে। একদম সীমান্তের কাছাকাছি গ্রাম আমাদের এটা। অসুখ-বিসুখ হলে পরে তো চ্যাঁংড়াগরক, ছোল-পলোক (কম বয়সী ছেলে), গাড়িয়ালাকরোক ডাকলেও যায় না। আঁতে-আন্দারে (রাতে-অন্ধকারে) তো আরও কষ্ট। কষ্টত থাকিন (থাকা) না, খুবই কষ্ট। এলা কষ্টের কথা কারে কই।

একই গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস নামে আরেকজন বলেন, শুনোচি (শুনেছি) রাস্তা হচে (হচ্ছে), কিন্তু হচেই না। আজকে দিমু (দিব), কালকে দিমু, খালি অ্যাসে (এসে) ভোট চায়। ভোট দিয়ে আর হয় না। এখানে চলাফেরার খুবই সমস্যা। পানি হলে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নাই। জুতা খুলে, মালকাচ ম্যারে (লুঙ্গির কোঁচা পেছনে কোমরে শক্ত করে গুঁজে নেওয়া) যাওয়া নাগবে (লাগবে)। গাড়ি তো চলেই না।
আনোয়ারুল নামে আরেকজন বলেন, এখানে চলাফেরা খুব অসুবিধা, সীমান্ত জায়গা, পুলিশ-প্রশাসন আসতেও খুব কষ্ট হয়। এখানে ফট করে বাংলার বিডিআরও (বিজিবি) আসতে পারে না। কিছু হলে দুই কিলো-তিন কিলো মাটি ফাঁকে যায়ে গাড়ি ধরা লাগে।
তিনি আরও বলেন, বর্ষার সময় বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার সময় তাদের পোশাকে কাদা-পানি লেগে যায়। অনেক সময় পুরো শরীরে কাদা মেখে যায়। অতিদ্রুত সময়ের মধ্যে এই রাস্তার কাজ হোক- এটাই আমার চাওয়া।
স্থানীয় ধলাহার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক বলেন, রামকৃষ্ণপুর ও কল্যাণপুর এক নম্বর ওয়ার্ড। সেখানে প্রায় সাতশ পরিবারের আনুমানিক তিন হাজার মানুষ বসবাস করে। ওই রাস্তাটি দিয়ে তাদের চলাচল করতে হয়। আমি সরকার ও সংশ্লিষ্টদেরকে অনুরোধ জানাবো এই প্রত্যন্ত এলাকার রাস্তা দ্রুত করে দেওয়া হোক।
জয়পুরহাট জেলা এলজিইডি কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম আকন্দ বলেন, কদমতলী মোড় হতে রামকৃষ্ণপুরের রাস্তাটির ৫০০ মিটার পাকা করা আছে। আর কিছু অংশ এইচবিবি করা আছে। এটি সীমান্তবর্তী ও বিজিবির কানেকটেড রাস্তা। আগামীতে নতুন প্রজেক্টের প্রস্তাবনা চাওয়া হলে আমরা রাস্তাটি অন্তর্ভুক্ত করে বাস্তাবায়ন করার চেষ্টা করবো।
চম্পক কুমার/আরএআর
