বিজ্ঞাপন

পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিতে তছনছ গ্রাম, দিশেহারা শতাধিক পরিবার

পাহাড়ি ঢল আর ভারী বৃষ্টিতে তছনছ গ্রাম, দিশেহারা শতাধিক পরিবার

দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, কয়েক দিন আগেও এখানকার বাড়িঘরগুলো ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ঠিকানা। পাহাড়, ঘন সবুজ গাছপালা আর মাটির ঘরবাড়িতে সাজানো শান্ত গ্রামটি এখন যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও ঘরের চাল ভেঙে গেছে। কোনো কোনো বাড়িতে পড়ে আছে কাদামাটি, ভাঙা আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির সামগ্রী। উঠানজুড়ে ছড়িয়ে আছে পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া কাপড়চোপড়, বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার জামতলী বাজার ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে গত শুক্রবার রাতের অতি ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাতের আঁধারে হঠাৎ নেমে আসা পানির স্রোতে তলিয়ে যায় বসতবাড়ি। পানির তোড়ে মাটির তৈরি ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়ে। ভেসে যায় আসবাবপত্র, রান্নার সরঞ্জাম, হাঁস-মুরগি ও গৃহস্থালির নানা সামগ্রী। অনেক পরিবার হারিয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, কেউ হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি। ফলে একদিকে ঘরবাড়ি হারানোর শোক, অন্যদিকে খাবার ও থাকার সংকটে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে তাদের।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, দ্রুত তালিকা তৈরি করে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।

দীঘিনালা উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন অতি ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হলেও জামতলী ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেশি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় এ এলাকায় সাধারণত বন্যার পানি ওঠে না। কিন্তু শুক্রবার রাতের অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নেমে এসে পরিস্থিতি বদলে দেয়।

রাতের বৃষ্টির সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে বাড়তে থাকে পানি। ঘুমন্ত মানুষজন আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটে যান। আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ পরিবার ঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পায়নি। কেউ শুধু জীবন বাঁচাতে পেরেছেন, কেউ আবার স্বজনদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে।

জামতলী এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগমের ঘরেও পানি ঢুকে পড়ে গভীর রাতে। তিনি বলেন, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ বুঝতে পারেন ঘরের ভেতর পানি উঠে গেছে। পরিস্থিতি এত দ্রুত খারাপ হয়ে যায় যে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবন বাঁচাতে বাইরে বেরিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমেনা বলেন, ঘরের কোনো জিনিসই রক্ষা করতে পারেননি। শোকেস, ড্রেসিং টেবিলসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা কিছু স্বর্ণালংকার ও রুপার চেইনও হারিয়ে গেছে। পানিতে নষ্ট হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পরিচয়পত্রও।

তিনি বলেন, আমরা ঘুমিয়েছিলাম। ঘুমের মধ্যে উঠে দেখি ঘরে পানি উঠে গেছে। জীবন নিয়ে পালিয়েছি। ঘরে যা ছিল, কিছুই বাঁচাতে পারিনি। পরনের কাপড়টাও বাঁচাতে পারিনি। এখন খুব কষ্টের মধ্যে আছি।

সুধীর মেম্বার পাড়ার গান্ধিলাল চাকমার ঘরও বন্যার পানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন কোথায় থাকবেন, কীভাবে খাবারের ব্যবস্থা করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তার ভাষ্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এলাকায় এলেও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোনো সহায়তা রেখে যাননি।

গান্ধিলাল বলেন, বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এখন কোথায় যাব, কোথায় থাকব কিছুই বুঝতে পারছি না। থাকার জায়গা নেই, খাবারও নেই। আমরা খুব অসহায় অবস্থায় আছি। এখন আমাদের কী হবে, কোথায় যাব কেউ খোঁজও নিচ্ছে না।

একই এলাকার বিনা চাকমার ঘরেও বন্যার পানি ঢুকে আসবাবপত্র ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। রান্নাঘর ও চুলা পানিতে ভিজে যাওয়ায় রান্না করেও খেতে পারছেন না তিনি।

বিনা চাকমা বলেন, কেউ আমাদের সাহায্য দেয়নি। এক মুঠো চালও পাইনি, এমনকি এক মুঠো ভাতও কেউ দেয়নি। রান্নাঘর ও চুলা সব পানিতে ভিজে আছে, তাই রান্না করে খেতে পারছি না। ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

জামতলী এলাকায় ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন নাসিমা বেগমও। তার ঘর পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। ঘর থেকে কোনো মালামাল বের করতে পারেননি। মারা গেছে তার হাঁস-মুরগিও।

নাসিমা বলেন, হঠাৎ পানি উঠে আমার ঘরবাড়ি সব ভেঙে গেছে। ঘর থেকে কোনো কিছুই বের করতে পারিনি। আমার হাঁস-মুরগিগুলোও মারা গেছে। আমি কোনোভাবে নিজের জীবন নিয়ে বাইরে বের হয়ে এসেছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ আমার খোঁজ নেয়নি।

জামতলী বাজারের প্রতিবন্ধী সাহানার কষ্ট আরও গভীর। স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির বাইরে। দুই সন্তানকে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছিলেন তিনি। বন্যায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়েছেন।

সাহানা বলেন, আমি একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। কোথায় যাব, কীভাবে থাকব কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার বালিশ-তোসক, ঘরের জিনিসপত্র সব পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি মুরগিগুলোও কোথায় চলে গেছে, জানি না। এখন আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।

তিনি জানান, তার স্বামী প্রায় এক মাস আগে বাড়ি থেকে চলে গেছেন। দুই সন্তানকে নিয়ে এমনিতেই কষ্টে ছিলেন। বন্যার পর ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী হারিয়ে এখন তার সামনে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

শুধু বসতবাড়িই নয়, ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে স্থানীয় খামারিদেরও। বন্যার পানিতে জামতলী এলাকার খামারি ইয়াসমিন আক্তারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ মুরগি মারা গেছে। পানিতে ভেসে গেছে খামারের আসবাবপত্র, খাদ্য ও ভুষিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

ইয়াসমিন আক্তার বলেন, রাতের দিকে বৃষ্টির সঙ্গে পানি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে। তখন দরজা খুলে কোনো রকমে বাইরে বের হয়ে আসি। খামারে এসে দেখি কোমর পানি হয়ে গেছে। কিন্তু তখন আর কিছুই করার ছিল না।

তিনি জানান, খামারের মুরগিগুলো মারা যাওয়ায় তার ব্যবসা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের কাছে তার ঋণ রয়েছে।

ইয়াসমিন বলেন, বন্যায় আমার প্রায় ১ হাজার ৫০০ মুরগি মারা গেছে। এতে আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এর মধ্যে আমার বিভিন্ন জায়গায় ঋণ রয়েছে। কৃষি ব্যাংকে প্রায় ৩ লাখ টাকা, আরও বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে ঋণ আছে। কিছু ঋণ পরিশোধ করেছি, কিছু এখনো বাকি। স্বর্ণালংকারও বন্ধক রাখতে হয়েছে।

আমার নিজের আর কোনো সম্বল নেই। সরকার, এনজিও বা কোনো ব্যক্তি যদি আমাকে একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে আবার নতুন করে দাঁড়াতে পারব।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্য সহায়তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যোগও জরুরি। যেসব ঘর মাটির তৈরি ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ফলে বৃষ্টি থামলেও এসব পরিবারের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নেই। অনেক পরিবারকে এখন আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, ঘরবাড়ির পাশাপাশি পানিতে নষ্ট হয়েছে ধান-চাল, পোশাক, আসবাবপত্র, রান্নার সামগ্রী, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও জীবিকার সরঞ্জাম।কৃষি মাঠ ফসল,পুকুরের মাছ, গৃহপালিত পশু-পাখিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে একসঙ্গে খাদ্য, বাসস্থান ও আয়ের সংকটে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অধিকাংশ ঘর মাটির তৈরি হওয়ায় পানির প্রবেশে ঘরগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জামতলী ও আশপাশের এলাকাতেই শতাধিক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছি। বর্তমানে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে অ্যাসেসমেন্টের কাজ চলছে। অ্যাসেসমেন্ট শেষ হলে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া যাবে। সেই বরাদ্দ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও জানান, ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুকনো খাবার বিতরণের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

তবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে ফিরবে তাদের স্বাভাবিক জীবন? ভেঙে পড়া ঘর কোথায় দাঁড়াবে, হারিয়ে যাওয়া সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কীভাবে ফিরবে, আর জীবিকার ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই তাদের। পাহাড়ি ঢল ও মেঘভাঙা বৃষ্টির এক রাতেই যেসব পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে, তাদের কাছে এখন সরকারি সহায়তা ও পুনর্বাসনই একমাত্র ভরসা।

মোহাম্মদ শাহজাহান/এসএইচএ