বিজ্ঞাপন

সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুট, রক্ষা পায়নি মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থানের বরাদ্দও

সরকারি প্রকল্পের অর্থ লুট, রক্ষা পায়নি মসজিদ-মন্দির ও কবরস্থানের বরাদ্দও

গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের (পিআইও) টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-লুটপাট ও আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০২৩-২০২৪, ২০২৪-২০২৫ ও  ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বরাদ্দ হওয়া সরকারি অর্থের লাখ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এসব অনিয়ম ও লুটপাটে ছাড় পায়নি মসজিদ-মন্দির কিংবা কবরস্থানে বরাদ্দ হওয়া প্রকল্পের অর্থও। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও অনুসন্ধান বলছে, পিআইও অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকল্প সভাপতি এবং এ সবের বাইরে তাদের ঘনিষ্টজনদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এসব অর্থ লুটপাট করা হয়েছে এবং চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেনো প্রকল্পে শর্ত সাপেক্ষে দেওয়া হয়েছে মোট বরাদ্দের পাঁচভাগের মাত্র এক ভাগ, কোনটাতে দেওয়া হয়েছে বারদ্দের অর্ধেক অর্থ। আবার কোনো প্রকল্পের পুরো অর্থই আত্মসাত করা হয়েছে। এছাড়া কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে এবং নামে-বেনামে প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

এসব অনিয়ম ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন প্রকল্প এলাকার স্থানীয় সচেতনমহল এবং অর্থ বঞ্চিত হওয়া মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থান সংশ্লিষ্টরা। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দের আত্মসাত হওয়া এসব অর্থ ফেরত পাওয়াসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গাইবান্ধার সদর উপজেলায়  ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। 

গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) দ্বিতীয় পর্যায়ে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর উত্তরপাড়া কবরস্থান সংস্কার’ প্রকল্পে দুই লাখ, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা) তৃতীয় পর্যায়ে ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার’ প্রকল্পে ৫ দশমিক ৩৪৩ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এছাড়া ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণবেক্ষণ (টিআর) প্রকল্পের আওতায় বাদিয়াখালী ইউনিয়নে ৭নং ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন প্রকল্পে ৫২ হাজার টাকা এবং একই অর্থ বছরে লক্ষীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া মাজে মসজিদ উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সম্প্রতি কয়েকদিনের সরেজমিন খোঁজ-খবর ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, গিদারী ইউনিয়নের ‘কিশামত ফলিয়া ফারাজি পাড়া জামে মসজিদ মেরামত’ নামের প্রকল্পের বিপরীতে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও মসজিদে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০ হাজার টাকা। আবার মসজিদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান ছাড়া এই ৪০ হাজার টাকার খবরও নেই কমিটির অন্য সদস্যদের কাছে। এই প্রকল্পের সভাপতি ওই মসজিদের ইমাম তোহা খন্দকার। 

মসজিদের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের এই প্রকল্প সম্পর্কে তার জানা নেই। তারা মসজিদের জন্য এবছর সরকারি কোনো টাকা পাননি। একই কথা জানান মসজিদের অন্য সদস্যরাও।

প্রকল্প সভাপতি ইমাম তোহা খন্দকারের ভাষ্য, প্রকল্প সম্পর্কে তিনি তেমন কিছুই জানেন না। তিনি প্রকল্প কমিটির সভাপতি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ও ব্যাংক একাউন্টের চেকে স্বাক্ষর করেছেন। এর বাইরে তার কিছুই জানা নেই।  তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত প্রকল্পের বিষয়গুলো সারোয়ার ভাই দেখেন। চেকে স্বাক্ষর নিয়ে পরবর্তীতে তিনি (সারোয়ার) আর মসজিদ কমিটি কি করেছেন বিষয়টি আমার জানা নেই'। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প পরিচালনাকারী কিশামত ফলিয়া এলাকার সারোয়ার গিদারী ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মহিলা সদস্য জরিফুল বেগমের স্বামী। জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে মসজিদে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া বিষয়টি স্বীকার করেন সারোয়ার। তিনি বলেন, মসজিদ কমিটিকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্তেই প্রকল্প ধরানো হয়েছে। বাকি টাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবই তো জানেন? পিআইও অফিসে প্রকল্প কেনা-বেচা হয়। আমি এটি কিনে নিয়েছি।

এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে দ্বিতীয় পর্যায়ে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ‘আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর উত্তরপাড়া কবরস্থান সংস্কার’ প্রকল্পে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনও টাকা পায়নি কবরস্থান সংশ্লিষ্টরা। এমনকি প্রকল্প সম্পর্কে জানাও নেই কবরস্থান রক্ষণাবেক্ষণকারীদের।

কবরস্থান রক্ষণাবেক্ষণকারীদের মধ্যে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা কবরস্থানের জন্য কোনো সরকারি অর্থ পাইনি, জানতামও না। একই কথা জানিয়ে হারুণ মিয়া বলেন, উত্তরপাড়া এই কবরস্থান অনেক পুরাতন কবরস্থান। বরাদ্দটা পাওয়া গেলে প্রাচীর করা যেত। এসময় বরাদ্দের অর্থ ফেরত চেয়ে আত্মসাতে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।

একই অর্থবছরের কাবিখা তৃতীয় পর্যায়ে আরিফ খাঁ বাসুদেবপুর আউয়ালের বাড়ি হতে নজলার রহমান জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রায় সাড়ে ৫ টন গম বরাদ্দের এই প্রকল্পটির কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটিকে রাস্তা বলা হলেও সেটি মূলত কয়েকটি পরিবারের বাড়ির উঠান। এই প্রকল্পের সভাপতি রামচন্দ্রপুর ইউনিয়ের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম।

স্থানীয় বসবাসকারী আব্দুস সালাম বলেন, এখানে কোনো রাস্তা নেই, এটা বাড়ির উঠান। এখানে কোনও কাজ করা হয়নি। একই কথা জানান ছাইফুল ইসলাম ও মাহফুজার রহমান। 

প্রকল্প সভাপতি সাইফুল ইসলাম মোবাইল ফোনে কথা বলার শুরুতে ইটের কাজ করার দাবি করলেও এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অনেকদিন আগের কথা, দেখতে হবে কোন প্রকল্প।

এছাড়া গত ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর প্রকল্পের আওতায় বাদিয়াখালী ইউনিয়নে ‘৭ নং ওয়ার্ডের ছাট চকবরুল শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দিরের উন্নয়ন’ প্রকল্পে ৫২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু মন্দির পরিচালনা কমিটি টাকা পেয়েছে মাত্র ২৬ হাজার। বাকি অর্ধেক টাকা আত্মসাত করেছে পিআইও অফিস সংশ্লিষ্টরা। এ প্রকল্পের সভাপতি ওই মন্দিরের পুরোহিত নিকুঞ্জ কুমারশীল (দয়াল)।

মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোপাল চন্দ্র বর্মণ বলেন, আমাদেরকে প্রথম দফায় ২৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় বাকি টাকার জন্য পিআইও অফিসে গেলে জানানো হয় ওই টাকা নেই। একই কথা জানান প্রকল্পের সভাপতি ওই মন্দিরের সভাপতি নিকুঞ্জ কুমারশীল (দয়াল)।

এছাড়া একই অর্থ বছরে লক্ষীপুর ইউনিয়নের ‘বালাআটা উত্তরপাড়া জামে মসজিদ উন্নয়ন’ টিআর প্রকল্পে ৭২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মসজিদ কমিটি পেয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। অনুসন্ধান বলছে, বাকি ৩৭ হাজার টাকা পিআইও ও সংশ্লিষ্ট  ইউপি সদস্য ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। এই প্রকল্পের সভাপতি আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য ও স্থানীয় জাকিরুল ইসলাম।

উত্তরপাড়া জামে মসজিদের সেক্রেটারি আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, প্রকল্পে বরাদ্দ সম্পর্কে আমাদের জানানো হয়নি। ওয়ার্ডের মোস্তফা মেম্বার তিন দফায় ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। একই কথা জানান সভাপতি জাকিরুল। তিনি বলেন, মেম্বার ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে গেছেন।

লক্ষীপুর ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি মসজিদে ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছি। বাকি টাকা পিআইও স্যারের। তিনি জানান, পিআইও সাহেব আমাকে অর্ধেকের শর্ত দিয়েই প্রকল্পটি দিয়েছেন। 

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেও এমন হিসেব কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে এই ইউপি সদস্য জানান, পিআইওর শর্ত না মানলে প্রকল্প দিবেনা। এসময় আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমাকে দিয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। বর্তমান পিআইও (রিয়াজুল) সাহেব মন্দির-মসজিদ কিছুই মানেন নাহ, কবরস্থানের টাকাও খান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ক্যামেরায় আনুষ্ঠানিক কথা বলতে রাজি হননি সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম। তবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে উপসহকারী প্রকৌশলী (বর্তমানে গোবিন্দগঞ্জ) জুবায়ের রহমানের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবুজ কুমার বসাক ঢাকা পোস্টকে বলেন, অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে অবশ্যই বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাট-আত্মসাতের সুযোগ নেই। এমনটি হয়ে থাকলে, তা তদন্ত করে প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাসুম বিল্লাহ/আরকে

বিজ্ঞাপন