‘আগে পিরিয়ড হলে আমরা স্কুলে যাইতাম না। লজ্জা পাইতাম, আবার কী হয়— এসব নিয়েও একটু আতঙ্ক ছিল। পরে এ বিষয়ে জানতে পারলাম, স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার শুরু করলাম। এখন আমরা প্রত্যহই স্কুলে যেতে পারি। স্কুল কামাই করতে হয় না।’
কথাগুলো বলছিল তৃপ্তি আক্তার। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দুর্গম গোড়াদিঘা গ্রামের এই কিশোরী স্থানীয় একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাসিক (পিরিয়ড) নিয়ে একসময় যে লজ্জা ও ভয় তাকে কয়েক দিনের জন্য ঘরে আটকে রাখতো, এখন সেটা আর তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
তৃপ্তির সহপাঠী ইসমার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। সে বলে, আগে এসব হলে স্কুলে যেতে অনেক শরম (লজ্জা) হতো। কিন্তু এটা আসার পর আমরা এখন সব জানতে পেরেছি। আমাদের এলাকার অনেক মানুষও এসব নিয়ে লজ্জা পেতো। এখন সবাই বুঝেছে, এটা স্বাভাবিক। এখন তারাও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করে।
তৃপ্তি ও ইসমার এই পরিবর্তন শুধু দুই কিশোরীর গল্প নয়, দুর্গম হাওরাঞ্চলের একটি গ্রামের নারীদের মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দীর্ঘদিনের অজ্ঞতা, সংকোচ ও কুসংস্কার কাটিয়ে ওঠারও গল্প এটি।
মাসিক হলেই স্কুলে যাওয়া বন্ধ
গোড়াদিঘা হাওর এলাকার দুর্গম একটি গ্রাম। যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় পণ্য সহজলভ্য না হওয়ায় এখানকার নারীদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক প্রয়োজনই পূরণ করতে হয় সীমিত সুযোগের মধ্যে। মাসিকের বিষয়টিও ছিল তেমনই এক নীরব সংকট।
কিশোরীদের অনেকে মাসিক শুরু হলে কয়েক দিনের জন্য স্কুলে যেত না। কারও কাছে প্রয়োজনীয় স্যানিটারি উপকরণ থাকতো না, কেউ সহপাঠীদের কাছে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে সংকুচিত থাকতো। আবার অনেকের কাছে মাসিক ছিল এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে পরিবারের সঙ্গেও খোলামেলা কথা বলা হতো না। ফলে মাসের কয়েকটি দিন তাদের কাছে হয়ে উঠতো অস্বস্তি, ভয় ও অনিশ্চয়তার সময়।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগের পর। এখন কিশোরীরা জানে মাসিক কোনো অসুস্থতা নয়, এটি মেয়েদের শরীরের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কখন মাসিক হতে পারে, কীভাবে পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে, স্যানিটারি ন্যাপকিন কীভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যবহৃত ন্যাপকিন কীভাবে নিরাপদে ফেলতে হবে— এসব বিষয়েও তাদের ধারণা আগের চেয়ে পরিষ্কার।
ন্যাপকিনের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে তথ্য
গোড়াদিঘায় এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রাণ কোম্পানির ‘স্টেসেফ’-এর উদ্যোগ। দুর্গম এই জনপদের সহজ-সরল ও অনেক ক্ষেত্রে পড়ালেখার সুযোগ না পাওয়া মানুষদের সঙ্গে কথা বলে মাসিক নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কারণ মাসিক স্বাস্থ্য শুধু নারীদের বিষয় নয়— পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও এটি সরাসরি যুক্ত।
কয়েক মাস পর্যন্ত বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে এটি সহজলভ্য করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। গ্রামে থাকা পাঁচটি ফার্মেসিতে আগে ন্যাপকিন রাখা না হলেও সেখানে বিনামূল্যে ন্যাপকিন সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মোতালিবের বাড়িতেও ন্যাপকিন মজুত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। যাতে প্রয়োজনের সময় গ্রামের নারী ও কিশোরীরা তা সংগ্রহ করতে পারে। ফলে একটি দুর্গম গ্রামের নারীদের কাছে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কাপড় থেকে ন্যাপকিনে
গোড়াদিঘার নারীরা একসময় মাসিকের সময় কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করতেন। প্যাড কী, কেন ব্যবহার করতে হয়— এসব বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা ছিল না। সচেতনতা কার্যক্রমের ফলে সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এখন গ্রামের অধিকাংশ নারী ও কিশোরী মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আগের চেয়ে সচেতন। নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনায় তারা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন।
মোছা. তাজেফা আক্তার নামে এক কিশোরী বলে, আগে মনে হতো মাসিক হওয়া লজ্জার বিষয়। এখন বুঝি, এটা স্বাভাবিক। নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানাটাও জরুরি।
স্কুলে উপস্থিতিতেও পড়ছে প্রভাব
মাসিকের সময় স্কুলে অনুপস্থিতির অন্যতম কারণ প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয় স্কুলে নিরাপদ ও ব্যক্তিগতভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকা। গোড়াদিঘার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আগে এর প্রভাব ছিল। কিন্তু এখন কিশোরীরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে।
নিবেদিতা রাণী চৌধুরী নামে একজন শিক্ষক বলেন, মেয়েরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। প্রয়োজন হলে তারা শিক্ষককে জানায়। এ কারণে মাসিককে কেন্দ্র করে অনুপস্থিতিও কমেছে বলে আমাদের মনে হয়।
তবে শুধু ন্যাপকিন পেলেই সমস্যার পুরো সমাধান হয় না। স্কুলে পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ টয়লেট, পর্যাপ্ত পানি, সাবান এবং ব্যবহৃত ন্যাপকিন ফেলার নিরাপদ ব্যবস্থা থাকাটাও জরুরি।
গোড়াদিঘার কিশোরীদের কথায় পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। আগে নিজের শরীর নিয়ে প্রশ্ন করতে সংকোচ ছিল। এখন তারা জানতে চায়। আগে মাসিকের কয়েকটি দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হতো। এখন কীভাবে মাসিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে, তা জানার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে।
তৃপ্তি আক্তার বলে, এখন মাসিক হলে পড়াশোনা বন্ধ করতে হয় না। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে স্কুলে যেতে পারি।
বদলাতে হবে পরিবারের মানসিকতাও
কিশোরীদের সচেতন করার পাশাপাশি পরিবারগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি। মায়েরা যদি মেয়েদের সঙ্গে মাসিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন, বাবারা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিনকে বিলাসপণ্য নয়, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপণ্য হিসেবে দেখেন এবং শিক্ষকরা যদি বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে আলোচনা করেন— তাহলে কিশোরীদের সংকোচ অনেকটাই কমে আসবে।
মোছা. লাকী আক্তার নামে একজন মা বলেন, আগে মেয়েকে এসব বিষয় বলতে সংকোচ হতো। এখন বুঝি, না বলার কারণ নেই। মেয়ের স্বাস্থ্য ভালো থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গোড়াদিঘার মতো প্রত্যন্ত এলাকায় এই মানসিক পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে একটি পরিবারের সিদ্ধান্তই অনেক সময় কিশোরীর স্কুলে যাওয়া, স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাসের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
গোড়াদিঘার পরিবর্তনকে শুধু একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের গল্প হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। এটি আসলে একটি সামাজিক পরিবর্তনের গল্প— যেখানে মাসিক নিয়ে লজ্জার জায়গা দখল করছে জ্ঞান, অজ্ঞতার জায়গায় তৈরি হচ্ছে সচেতনতা এবং ভয়কে সরিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে আত্মবিশ্বাস।
যে কিশোরী একসময় মাসিকের কারণে কয়েক দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিত, সেই কিশোরী এখন মাসিকের দিনেও ক্লাস করছে, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মোতালিব বলেন, এই গ্রামের চারপাশে পানি। দুর্গম এই গ্রামে আগে প্যাডের ব্যবহার ছিলো না, নারীরা এসব সম্পর্কে জানতো না। এখন বিষয়টি সম্পর্কে নারী-পুরুষ সবাই সচেতন।
যা বলছে পরিবর্তনের পেছনের উদ্যোক্তারা
‘স্টেসেফ’ বাংলাদেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে ২০১৭ সালে। পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ডটির বিভিন্ন সচেতনতামূলক উদ্যোগে মাসিক স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘হাওরে প্যাড যেন ‘সোনার হরিণ’/পুরোনো কাপড়ে হচ্ছে মারাত্মক সংক্রমণ’ শিরোনামে ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশিত। এরপর সান কমিউনিকেশনের পরিকল্পনায় এবং স্টেসেফের উদ্যোগে দুর্গম গোড়াদিঘার মেয়েদের জীবন বদলাতে শুরু করে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্র্যান্ড ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের আইডিয়াটা আসলে ঢাকা পোস্টের একটা নিউজ থেকে আসা। আমরা প্রায় বছরখানেক আগে ঢাকা পোস্টে একটা নিউজ দেখি যে কিশোরগঞ্জে এ রকম একটা এরিয়া আছে, যেখানে আসলে মানুষজন স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে জানতো না। এই বিষয়টা জানার পর আমার কাছে মনে হয়েছে যে স্টেসেফ যেহেতু মেয়েদেরকে নিরাপদে রাখার কথা বলে, তাই আমরা এই সকল মেয়েদের জন্য, এখানকার যে মানুষ আছে তাদের জন্য কিছু একটা করতে পারি। যেটা আমার ব্র্যান্ডের পাশাপাশি সে মানুষগুলোকেও অনেক হেল্প করবে, তাদেরকে সচেতন করবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা তাদের কাছে পৌঁছে দেই। বিভিন্ন আনন্দমূলক ইভেন্টের মাধ্যমে আমরা এখানে মেলার আয়োজন করি। আমরা এখানকার মানুষের নিয়মিত যে জীবনযাপন, তাদের লুডু খেলা, উঠান বৈঠক, বিভিন্ন স্কুলে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা এবং এখানকার যে ফার্মেসিগুলো আছে সে ফার্মেসিগুলোতেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, বিশেষ করে যারা ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করে তাদেরকে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিষয়টা, পিরিয়ডের বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক এবং একটা জনগোষ্ঠী এতটা পিছিয়ে আছে। অ্যাজ এ ব্র্যান্ড, অ্যাজ এ বাংলাদেশি পিপল- এটা আসলে আমাদের কাছে খুবই দুঃখজনক মনে হয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমরা বর্তমানে এসে যেটা দেখতে পাচ্ছি যে এখানকার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ পার্সেন্ট মেয়েরাই আমাদের সেই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং এখানকার মেয়েরা এখন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে, যেটা খুবই ইতিবাচক। আমরা চাই এই সচেতনতা শুধু গোরাদিঘায় না, সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/আরএআর
