কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে সার লুটের ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। অপরদিকে বিসিআইসি (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) এর তদন্ত কমিটি গতকালই তদন্ত শেষ করে ঢাকায় ফিরে গেছেন। আর স্থানীয় তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
স্থানীয় তদন্ত প্রতিবেদনে সাধারণ কৃষকদের হয়রানি ও সার বিক্রি না করে যারা কৃষক নয় তাদের কাছে সার বিক্রি করা এবং ভাউচারে অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিসিআইসির ডিলার তাইফুর রহমান মুকুল হাজীর প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিসিআইসি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে জেনারেল ম্যানেজারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি তদন্ত শেষে ঢাকায় চলে গেছেন।
বিষয়টি নিয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা তদন্ত কমিটির সভাপতি সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষদর্শী, ডিলার ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত প্রতিবেদন ইউএনও’র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি, ডিলার মালিক ও স্থানীয় কৃষক সূত্রে জানা যায়, শিলখুড়ি ইউনিয়নের ডিলার শাহ আমানত ট্রেডার্স এর মালিক তাইফুর রহমান মুকুল পর্যাপ্ত পরিমাণ সার বরাদ্দ পেলেও কৃষকদের দিতে গড়িমসি করেন। তিনি ইতোমধ্যে কয়েক দফায় ১৩৬০ বস্তা সার বরাদ্দ পান। তারপরও চাষীরা তার কাছে গেলে সার নেই অজুহাতে ফেরত আসেন। ফলে অন্য ইউনিয়নে গিয়ে তাদেরকে বাড়তি মূল্যে সার কিনে আনতে হয়।
বর্তমানে রোপা আমন চারা রোপণের কাজ শেষ পর্যায়ে। এখন জমিতে সার প্রয়োগ অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্যই কৃষকরা বারবার ডিলারের কাছে সারের জন্য ধরনা দিচ্ছিলেন। গত রোববার ছিল সার বিতরণের তারিখ। ভোর থেকে কৃষকরা ডিলার পয়েন্টে অবস্থান করছিলেন। বেলা গড়িয়ে গেলেও বিতরণ শুরু না করায় কৃষকদের সাথে ডিলারের লোকজনের সাথে কথা কাটাকাটি হয়।
এরমধ্যে কৃষকরা জানতে পারেন, গুদামে মাত্র ৩৪০ বস্তা সার সংরক্ষণে আছে। এর বেশি সার নেই। ডিলার পয়েন্টে তখন ৩ থেকে ৪ শতাধিক কৃষক সারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এরই মধ্যে ডিলার ও কৃষকদের সাথে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। কৃষকদের অনুরোধের পরও ডিলার পয়েন্ট না খোলায় সার না পাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকেরা গুদামের দরজা ও টিনের বেড়া ভেঙে ৫০ কেজি ওজনের ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান। এখন পর্যন্ত ১২০টি সারের বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে।
এ ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ওইদিন রাতেই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা প্রশাসন। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। পরে প্রতিবেদনটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ বলেন, শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার লুটের ঘটনায় ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন ও প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ডিলারের বিরুদ্ধে রেজিস্টার্ড খাতা, ভাউচারে অসঙ্গতি, অকৃষকের মধ্যে সার বিতরণের সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার বরাবর প্রেরণ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে কর্তৃপক্ষ বলে জানান তিনি। এ কারণে তাকে শোকজ করা হয়েছে।
অপরদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার লুটের ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কেন্দ্রীয়ভাবে জেনারেল ম্যানেজারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিসিআইসি তদন্ত কমিটি গতকালই তদন্ত শেষ করে ঢাকায় ফিরে গেছেন। আর স্থানীয় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষকদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নেই। চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তাই অগ্রিম সার ক্রয় করার প্রয়োজন নেই। কোনো কৃষক ডিলারদের নিকট থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেলে সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন থেকে সার প্রদান করা হবে এবং তা পরবর্তীতে কৃষি অফিস সমন্বয় করবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলায় বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি) এর আওতায় ১১৪ জন ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) আওতায় ৯৪ জন সার ডিলার রয়েছে। প্রতি ইউনিয়নে বিএডিসি ৩ জন ও বিসিআইসি ১ জন ডিলার রয়েছে।
মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ
