নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে দিন দিন বেড়েই চলেছে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত। পৌরসভা থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব কুকুর। রাস্তাঘাটে পথচারী, শিশু ও মোটরসাইকেল আরোহীদের পিছু নেওয়া এবং তেড়ে আসার ঘটনায় সর্বত্র তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ জন মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। সে হিসাবে উপজেলাটিতে প্রতি মাসে গড়ে দুই শতাধিক মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হচ্ছেন।
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ জন কুকুরের কামড়ে আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। সে হিসাবে মাসে গড়ে ২১০ থেকে ২৪০ জন কুকুরের কামড়ের চিকিৎসা নিচ্ছেন এই হাসপাতালে। এর বাইরে স্থানীয় ক্লিনিক কিংবা অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের হিসাবও রয়েছে।
উপজেলার আড়াইহাজার ও গোপালদী পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও ব্রাহ্মন্দী, দুপ্তারা, ফতেহপুর, সাতগ্রাম, মাহমুদপুর, বিশনন্দী, হাইজাদী, খাগকান্দা ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কুকুরের উৎপাতের কথা জানিয়েছেন বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একসঙ্গে ৮ থেকে ১০টি কুকুর রাস্তায় অবস্থান করায় শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে। কুকুরের তাড়া খেয়ে দৌড়াতে গিয়ে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। আবার অনেকেই সরাসরি কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে ছুটছেন।
সকাল হলেই শিশুদের স্কুলে যাতায়াত শুরু হয়। দুপুরে শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরে। বিকেলে প্রয়োজনীয় কাজে বের হন নারী ও বয়স্করা। এসব সময় সড়কে দলবদ্ধ কুকুর থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের একা বাইরে পাঠাতে চাইছেন না।
রামচন্দ্রদী এলাকার বাসিন্দা মহসিন বলেন, ‘আমার সন্তানকে একা স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কুকুরের দল থাকে। শিশুদের দেখলেই কয়েকটি কুকুর তেড়ে আসে।’
দুপ্তারা এলাকার অভিভাবক রাশেদা আক্তার বলেন, ‘কয়েকটি কুকুর একসঙ্গে থাকলে বাচ্চারা ভয় পেয়ে দৌড় দেয়। এতে কুকুরের কামড়ের পাশাপাশি দুর্ঘটনারও আশঙ্কা থাকে।’
ফতেহপুর এলাকার শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে কুকুরের দল থাকলে ছোট শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে।’
গোপালদী পৌরসভার বাসিন্দা হালিম বলেন, ‘সন্ধ্যার পর রাস্তায় বের হলে দলবদ্ধ কুকুর দেখা যায়। মোটরসাইকেল দেখেও অনেক সময় কুকুর পেছনে দৌড়ায়।’
ব্রাহ্মন্দী এলাকার সাহেদা আক্তার বলেন, ‘বাসার সামনে কয়েকটি কুকুর বসে থাকে। একা বের হতে ভয় লাগে। বাচ্চাদের নিয়েও চিন্তা হয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাজার ও আবাসিক এলাকায় যত্রতত্র খাবারের উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্য ফেলে রাখায় এসব স্থানে কুকুরের আনাগোনা বাড়ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে কুকুরের দলবদ্ধ অবস্থান কিছুটা কমানো সম্ভব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বেওয়ারিশ কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিনের সংকট থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আড়াইহাজার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতাউর রহমান বলেন, ‘উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকায় বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করা যাচ্ছে না। তবে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার কার্যক্রম রয়েছে। কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিনের সংকট থাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়। আমরা ভ্যাকসিন দিয়ে থাকি। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে। সরবরাহ পাওয়া গেলে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।’
আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কুকুরের কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হলে কোনো ধরনের অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।’
মো. মীমরাজ হোসেন/বিআরইউ
