চলতি মৌসুমে পাটের আশানুরুপ ফলন না পেয়ে হতাশ লালমনিরহাটের পাটচাষিরা। অল্প ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন তারা।
উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম না পেলে গত কয়েক বছরের মতো এবারো লোকসানের মুখ দেখবেন তারা। পাশাপাশি আগামী মৌসুমে পাট চাষে নিরুৎসাহিত হবে এই জেলার কৃষকেরা। তাদের সোনালি আঁশের স্বপ্ন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।
জেলার আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে এবং জেলার কিছু কিছু উচু এলাকার জমিতেও পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের মাঝে। যেসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ভালো হয় না, সেসব জমিতেও পাটের আবাদ করেছে কৃষকেরা। তবে ফলন ভালো না হওয়ায় এবং ভালো দাম না পেয়ে হতাশ অনেকে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জাগ দেওয়া বা পচানো পাট থেকে আঁশ বের করার কাজে জোর দিয়েছে কৃষকেরা। কোনো কোনো কৃষকের পাট এখনও পরিপূর্ণ জাগ বা পচানো হয়নি তবে কিছু দিনের মধ্যে পুরোপুরি শেষ হবে পাট থেকে আঁশ ছারানোর পর্ব।
কৃষকেরা পাট কাটার পরে ডোবা নালা পুকুর ও খাল বিলের পানিতে বিশেষ কায়দায় স্তুপ আকারে রেখে দেয় পাট, ২০-২৫ দিন পরে জাগ আসলে বা পচন হলে সেখান থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নিয়ে রৌদ্রে শুকিয়ে নেয়।
কৃষকরা জানান, এ বছর চলতি মৌসুমের শুরুতে খরার কারণে পাটের জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। আবার পরবর্তীতে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন কিছুটা কমেছে। এ বছর অনেক এলাকায় রোগবালাইয়ের প্রকোপও তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে পাটের ফলন আশানুরূপ হয়নি।
পাট চাষিরা জানান, গত কয়েক বছর পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের। কখনো কখনো পাট বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। কৃষক বলছে, তাদের কাছে এক সময়ের সোনালী আঁশ গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এবারো ফলন ভালো না হওয়ার পাশাপাশি ভালো দাম না পেলে সেই ক্ষত শুকবে না তাদের।
পাটের বাজার নিয়ে কৃষকদের মধ্যে রয়েছে বড় শঙ্কা। কৃষকের অভিযোগ, পাট কাটার মৌসুমে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এতে কৃষকরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। অথচ পরে সেই পাটই বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পাট চাষিরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। ধান ও গমের মতো পাটের ক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
আদিতমারী উপজেলার পাটচষি আব্দুল আহাদ বলেন, প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ,উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। তাদের দাবি, যারা প্রকৃতপক্ষে পাট চাষ করেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।
কালীগঞ্জের কৃষক আব্দুর রাসেল বলেন, পাটের জমিতে পানি জমা হয়ে থাকার কারণে এবার পাটের গাছ লম্বা হয়নি ফলে পাটের আঁশ ভালো হয়নি। এবারও আমদের লোকশানের মুখ দেখতে হবে।
চরাঞ্চলের কৃষক রমনী কান্ত বলেন, আমরা প্রতিবার আশা নিয়ে পাট চাষ করি কিন্তু প্রতিবারই লোকশানের মুখ দেখি। অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের গাছ আশানুরূপ বড় হয়নি তাই ফলন কম হয়েছে। আমরা চাই সরকার পাটের দাম নির্ধারণ করে দিক। এতে কিছুটা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. মতিউল আলম জানান, এ বছর জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়। যেখানে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১০ হেক্টর, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর জমিতে বেশি চাষ হলেও। এবার অতিবৃষ্টির কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবে আশা করি আগামী বছরে আবহাওয়া ভালো থাকলে ফলন ভালো হবে। এই জেলায় তোশা পাট, দেশি পাট ও ক্যানাফ পাট নামে ৩ ধরনের পাট চাষ করা হয়।
আরকে
