বিজ্ঞাপন

রংপুরে ৪ খুন

ডোমের বক্তব্যে ‘ধর্ষণের আলামত’ নিয়ে যা জানাল পুলিশ

ডোমের বক্তব্যে ‘ধর্ষণের আলামত’ নিয়ে যা জানাল পুলিশ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে। তবে নিহত শিক্ষকের স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর মরদেহে ধর্ষণ বা ধর্ষণের চেষ্টার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

ময়নাতদন্তে বীর্য পাওয়ার যে বিষয়টি সামনে এসেছে, সেটিও মরদেহের স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কনফারেন্স রুমে সংবাদ সম্মেলন এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

তিনি বলেন, আসামিদের পুলিশের কাছে দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্য এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে অনেক বিষয় আরও স্পষ্ট হয়েছে। ময়নাতদন্তের যে প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি, তাতে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

আবদুল মাবুদ বলেন, নিহতদের প্রতি সম্মান রেখে বলছি, তাদের ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে সেখানে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। শ্বাসরোধ বা অ্যাসফিক্সিয়ার ক্ষেত্রে মরদেহে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়। এ সময় বীর্য, মলমূত্র বের হয়ে আসতে পারে। ময়নাতদন্তে যে বীর্যের কথা এসেছে, সেটি মরদেহের স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার অংশ। এটি বাইরের কোনো ব্যক্তির বীর্য নয়।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় একজন ডোমের বক্তব্য নিয়ে যে কথা প্রচার হয়েছে, সেখানেও মরদেহ থেকে বীর্য বের হওয়ার কথা বলা হয়েছে। শ্বাসরোধের ক্ষেত্রে গলায় ফাঁসের চিহ্ন এবং চোখ কিছুটা বেরিয়ে আসার মতো শারীরিক লক্ষণ দেখা যেতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে এসব বিষয়ও স্পষ্ট হয়েছে।

এর আগে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের এক ডোমের বক্তব্য একটি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ডোমের দাবি, শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীর শরীরেও ধর্ষণের আলামত ও বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলে তিনি ভ্যাজাইনা ও বীর্যের নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন।

এ ব্যাপারে রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, মরদেহের পরীক্ষায় যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ল্যাবরেটরিতে পাঠানো নমুনাতেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

ময়নাতদন্তকারী এ চিকিৎসক বলেন, মরদেহগুলোতে বিভিন্ন ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। চারটি মরদেহের গলায় দাগ ছিল। কোনো কোনো লাশের বুকে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে এসব আঘাত মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়।

বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, মরদেহগুলো উদ্ধারের পর অনেক দেরিতে তাদের কাছে আসায় সেগুলোতে পচনের পর্যায়ে গিয়েছিল। চারজনেরই মৃত্যু শ্বাসরোধে হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।

উদ্ধার হওয়া মরদেহের মুখ কালো হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে তরল পদার্থ কোনো রাসায়নিক বা কেমিক্যাল বার্নের ছিল কি না— এর জবাবে তিনি জানান, মরদেহের মুখ কেমিক্যাল দিয়ে ঝলসানোর নয়।

ডা. বাবলু কিশোর জানান, এটা হচ্ছে পচন প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। যে অংশটা এক্সপোজড থাকে, সাধারণত সে অংশটা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যায় এবং পুরো বডি আস্তে আস্তে পচনের প্রক্রিয়াতেই কালো হয়ে যায়। এটার মধ্যে কোনো অ্যাসিড ঝলসানোর কোনো কিছু নেই।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার নিজ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।

রোববার বিকেলে নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুইজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।

বর্তমানে আলোচিত এ মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিনাত আলী এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর

বিজ্ঞাপন