বিজ্ঞাপন

৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প, কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়ক। প্রায় ১৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সংস্কারে প্রায় ৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। বরং উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ না করেই প্রকল্পের প্রায় পুরো অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বর্তমানে সড়কটির অধিকাংশ অংশ বেহাল হয়ে পড়েছে। এতে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এ পথে চলাচলকারী হাজারো মানুষ। একই সঙ্গে জেলার অন্যতম বড় ভাসমান সবজির বাজার বৈঠাকাটার সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের যোগাযোগও ব্যাহত হচ্ছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বিডিআরইডব্লিউএসপি প্রকল্পের আওতায় নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কের উন্নয়নে মেসার্স ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় চারটি প্যাকেজে ১৬ দশমিক ৩ কিলোমিটার কার্পেটিং সড়ক, শূন্য দশমিক ৬ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক এবং ৩৩টি কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল।

প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুনে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও সড়কের মূল কাজ হয়নি। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, কাজ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ তুলে নিয়েছে।

তবে এলজিইডির নাজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জিয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তিনি বলেন, এই রাস্তার কাজে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ঠিকাদার তুলে নিয়ে গেছে। এরপর আর কোনো বিল নেওয়া হয়নি। অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।

বেহাল সড়কে চরম দুর্ভোগ

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কে পিচের অস্তিত্বও নেই। বর্ষাকালে এসব গর্তে পানি জমে সড়কটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে ভোগান্তি বাড়ে পথচারী ও যাত্রীদের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ১৫ বছর ধরে সড়কটির উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে দিন দিন সড়কটির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে আগের তুলনায় বেশি সময় লাগছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাগর বলেন, এই সড়কে ইজিবাইকের মাধ্যমেই মানুষজন চলাচল করেন। রাস্তা ভাঙা থাকায় গাড়িতে উঠলে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। এতে যাতায়াত খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। প্রায়ই এ সড়কে দুর্ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, আগে নাজিরপুর যেতে ৩০ মিনিটও লাগত না। এখন এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। অসুস্থ রোগী হাসপাতালে নেওয়ার মতো অবস্থা নেই। এই রাস্তা দিয়ে হাসপাতালে নিতে গেলে ঝাঁকুনিতে রোগী আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন।

থ্রি-হুইলার চালক মো. ইব্রাহিম বলেন, এই রাস্তায় চলতে গেলে গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ভেঙে যায়। প্রায় প্রতিদিনই গাড়ি সারাতে হয়। রাস্তা ভাঙা থাকার কারণে যাত্রীরাও গাড়িতে উঠতে চান না।

তিনি বলেন, আগে যে জায়গায় ২৫ মিনিটে যেতাম, এখন সেখানে দেড় ঘণ্টা লাগে। চার-পাঁচ বছর ধরে রাস্তার অবস্থা খুবই বেহাল।

কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগে ক্ষোভ

কাজ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। শাখারিকাঠি গ্রামের বাসিন্দা চুন্নু মোল্লা বলেন, শুনেছি রাস্তার টেন্ডার হয়েছিল। কিন্তু কাজকর্ম তো কিছুই হয়নি। এখন আমরা ভোগান্তির মধ্যেই আছি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটির উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। ফলে প্রকল্পের অর্থ কীভাবে উত্তোলন করা হয়েছে এবং এতে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

দুদকের মামলা

পিরোজপুরে এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে মেসার্স ইফতি ইটিসিএলসহ মোট আটটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল মামলা করে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিডিআরইডব্লিউএসপি প্রকল্পসহ এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

দুদকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলো বর্তমানে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পিরোজপুরের দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, সাবেক সংসদ সদস্য (পিরোজপুর-২) মহিউদ্দিন মহারাজ, সাবেক ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পৃথক আটটি মামলা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আসামিরা নিজেদের ও পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন—এমন অভিযোগে মামলাগুলো করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাগুলো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। প্রাথমিক অভিযোগের তুলনায় তদন্ত পর্যায়ে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কের উন্নয়নে মেসার্স ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের ছোট ভাই ও সাবেক ভাণ্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজের নাম উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন।

পিরোজপুর জেলার তৎকালীন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এলজিইডির সদর দপ্তর ও তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পিরোজপুর এলজিইডির উন্নয়নকাজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমন।

তিনি জানান, বন্ধ থাকা কাজগুলো চালু করতে গত ৯ আগস্ট সচিবালয়ে একটি সভা হয়েছে। সেখানে আইনি জটিলতা নিরসন করে নতুন দরপত্রের মাধ্যমে স্থগিত উন্নয়নকাজ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির কারণে পড়ে থাকা উন্নয়নকাজগুলো পুনরায় শুরু করতে এখন আর কোনো আইনি জটিলতা নেই। খুব দ্রুতই নতুন করে কাজগুলো শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, যে কাজ যেভাবে বা যে অবস্থায় পড়ে আছে, সেখান থেকেই অসমাপ্ত অংশ সম্পন্ন করার জন্য নতুন করে প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হবে। এরপর নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, যারা দুর্নীতি করেছেন এবং কাজ অসম্পূর্ণ রেখে চলে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলমান থাকবে এবং আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে।

কৃষিপণ্য পরিবহনেও প্রভাব

নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কটি শুধু পাঁচটি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের পথ নয়; জেলার অন্যতম বড় ভাসমান সবজির বাজার বৈঠাকাটার সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সড়কটি বেহাল থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা সড়কটির দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের উপযোগী করা হোক। এতে সড়কটি ব্যবহারকারী হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি বৈঠাকাটা বাজারের সঙ্গে নাজিরপুর উপজেলা সদরের যোগাযোগও সহজ হবে।

এসএইচএ