রংপুর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যার ঘটনার পর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও অদিত করের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে উঠে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো একটি ছবির সূত্র ধরে জানা যায়, পছন্দের অদিতের সাথে বিয়ের পিড়িতে বসার প্রস্তুতির ইঙ্গিত। কিন্তু মা-বাবা আর একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন আগামীও।
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর একমাত্র মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর প্রেমিক অদিত করকে চার খুনের ঘটনায় জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। অদিত কর তার প্রেমিক আগামী চক্রবর্তীর ফোন বন্ধ পেয়ে দু’দিন তাদের বাসায় খোঁজ নিতেও গিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে আরপিএমপি কমিশনারের কনফারেন্স রুমে মামলার তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেন, ‘আগামী চক্রবর্তীর যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল অদিত করের। ওনার সাথে আমরা কথা বলেছি। উনি ওনার বান্ধবীর (আগামীর) ফোন বন্ধ পেয়ে শুক্রবার এবং শনিবার (২১ ও ২২ আগস্ট) ওই বাড়ির সামনে দিয়ে অনেকবার যাতায়াত করেন এবং বাসার সামনে বসে থাকা কয়েকজন প্রতিবেশী নারীর সাথেও কথা বলেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেখানকার প্রতিবেশীরা অদিত করকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। ওনাকে সহযোগিতা করে নাই। আগামী চক্রবর্তীর পরিবার কোথাও বেড়াতে যেতে পারে বলেও তাকে জানানো হয়েছিল।’
অদিত কর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। আর তার প্রেমিকা আগামী চক্রবর্তী সম্প্রতি কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘদিনের পূর্বপরিচিত এ দুজনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাদকাসক্ত বখাটেদের নির্মমতায় শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেছে অদিত ও আগামীর নতুন জীবনের স্বপ্ন বুননের গল্প।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর অদিত কর নিজের ফেসবুক আইডিতে আগামী চক্রবর্তীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেই ছবিতে লিখেছেন__ ‘আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল। এটা (১৯ আগস্ট) বুধবারের ছবি। খুব করে বলল সেদিন আমরা তো কখনো কাপল পিক তুলি নাই, চলো আজকে তুলি। চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সাথে ছিলাম, আছি, থাকব।’
এরপর থেকেই অদিত কর তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিএক্টিভেট করে রেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে__আগামী চক্রবর্তীর ফোন বন্ধ পেয়ে অদিত কর দু’দিন বাসার সামনে খোঁজ করতে গিয়ে কোনো তথ্য না পেয়ে কেন বিষয়টি পুলিশকে অবগত করেনি। এমনকি এ ঘটনার পর এখন পর্যন্ত তাকে গণমাধ্যমে সামনে আসতেও দেখা যায়নি। তার এই আচরণের সঙ্গে চার হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন পূজা চক্রবর্তী। বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে একে একে বোনের স্বামী, তাদের মেয়ে এবং ছেলেকে ফোন করেন। সবারই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়ায় (দাসপাড়া) বোনের বাসার সামনে গিয়ে গেটে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশকে বিষয়টি অবগত করে।
স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে বাসায় গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।
রোববার বিকেলে নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুইজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বর্তমানে আলোচিত এ মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিনাত আলী এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ
