সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৯ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে মরদেহগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।
নিহত ৯ জনের মধ্যে সাতজনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা। বাকি দুজনের মধ্যে একজন রাজশাহীর বাগমারার ও অন্যজন নাটোরের নলডাঙ্গার বাসিন্দা। তবে আগুনের ঘটনায় নিহত মোহাম্মদ শামীম ও সাব্বির হোসেনের মরদেহ আসেনি। তারা দুজন নাটোরের নলডাঙ্গার বাসিন্দা। এই ঘটনায় নিহত অন্যদের মরদেহ দেশে আসায় শামীম ও সাব্বিরের পরিবার আসায় ছিল তাদের সন্তানদের সঙ্গে শেষ দেখা হবে। কিন্তু হলো না।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কথা হয় নিহত মোহাম্মদ শামীমের মা শাহিনুর বেগমের সঙ্গে। মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শোনালেন সন্তানকে শেষবারের মতো দেখার আকুতির কথা।
শাহিনুর বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে বেশি পুড়ে গেছে। চিনতে পারা যাচ্ছে না। এখন ডিএন টেস্ট করা লাগবে। শনিবার তার বাবা (জাকের আলী) ডিএন দিয়ে এসেছেন। সেগুলো ওই দেশে (সৌদি আরব) পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো দেখেনি। ৯ জনের মরদেহ পাঠিয়েছেন। এরপরে তাদের (ছেলেদের) সিরিয়াল ধরবে। আমার বোনপুত সাদ্দাম (বোনের ছেলে) ওই দেশেই কাজ করে। সে মোবাইল ফোনে আমাকে এভাবে বললো।’
তিনি বলেন, ‘শামীম এর আগেও সৌদি আরবে ছিল। দেশে ফিরে বিয়েও করেছিল। বিয়ের ছয় বছর পর আবার সৌদিতে যায়। তার স্ত্রী দুই মাসের সন্তান সম্ভাব অবস্থায় আবার গিয়েছিল। তার একটা কণ্যা সন্তান আল্লাহ দিয়েছেন। তার একমাস চার দিন বয়সে শামীমের মৃত্যুর খবর দেশে আসে। অভাব-অনটনের জন্য বিদেশে গিয়েছিল। দেশে ফিরে ভালো খাবে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। আমার একমাত্র ছেলে। সেই দুনিয়ে ছেড়ে চলে গেল। এখন ছেলের বৌ ও তার সন্তান নিয়ে থাকতে হবে।’
শাহিনুর বেগম আরও বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, তিনি যেন দূরত্ব ছেলের মরদেহ আমাদের কাছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ছেলের মৃত্যুর ১৮ দিন অতিবাহিত হলো। কিন্তু তার মরদেহ দেশে আসলো না। আজ (বৃহস্পতিবার) নাটোরের একজনের মরদেহ এসেছে। শুনলাম রাজশাহীর একজন ও নওগাঁর সবাই মরদেহ চলে এসেছে।’
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা চেষ্টা করা হয় অপর নিহত সাব্বির হোসেনের পরিবারের সঙ্গে। সাব্বিরের দেওয়া কাগজপত্রে থাকা মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও কেউ রিসিভ করেনি। এই সাব্বির হোসেনের মরদেহও দেশে আসেনি। তবে মরদেহ এসেছে নাটোরের রবিউল ইসলামের।
একই ঘটনায় মৃত্যু হয় রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের মরুগ্রামের শ্যামল উদ্দিন মাঝির। মরদেহে দেশে আশায় বিমান বন্দরে নিয়ে গিয়েছিলেন মৃতের জামাতা মিজানুর রহমান।
সন্ধ্যায় মিজানুর রহমান জানান, সব কার্যক্রম শেষে মরদেহ পাওয়া গেছে বিকেল ৫টার দিকে। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে রওনা হই। এলাকার মাইকে ঘোষণা করা হয়েছে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো তালিকা অনুযায়ী, আত্রাই উপজেলার নিহত সাতজন হলেন-উদনপৈ গ্রামের মো. ফরিদ, গন্ডগোহালি গ্রামের রুবেল প্রামাণিক, মোহন আলী, সুমন আলী ও কলিম উদ্দিন, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা এবং পার কাসুন্দা গ্রামের আব্দুল জলিল সরদার।
এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সৌদি আরবে প্রেরণ করাও হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিচয় শনাক্ত হওয়া নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজনের মরদেহ আসছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালায়ের বরাত দিয়ে ইউএনও বলেন, শুরুতে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেলেও বর্তমানে আত্রাই উপজেলার ১১ জন। নওগাঁ সদর উপজেলার একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি মরদেহগুলো দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অপরদিকে, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল এমরান খাঁন বলেন, প্রথম পর্যায়ে আজ নিহত রবিউলের মরদেহ দেশে এসেছে। মরদেহ দেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি দূতাবাসের বিষয়। যেসব মরদেহ শনাক্ত করা গেছে, সেগুলো হয়তো প্রথম ধাপে দেশে পাঠানো হয়েছে। বাকি মরদেহগুলো পরবর্তীতে দেশে আসবে।
প্রসঙ্গত, ৯ আগস্ট বাংলাদেশ সময় সাড়ে ৩টায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের মানফুয়া সানাইয়া এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগের নওগাঁ জেলার বাসিন্দা।
শাহিনুল আশিক/এএমকে
