বিজ্ঞাপন

সৌদির সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ড

‘নিজের চোখটারে বিশ্বাস করাতে পারছি না এরা সেই সোনা বাজান’

‘নিজের চোখটারে বিশ্বাস করাতে পারছি না এরা সেই সোনা বাজান’

‘ঘটনা ঘটছে কতদিন হয়া গেল, আর লাশ পাঠাইলো আজকে! এতগুলো দিন আমি ঘুমাইতে পারি নাই। আগুনে আমার ছেলে দুইটাকে একবারে কয়লা বানিয়ে দিছে। নিজের চোখটারে বিশ্বাস করাতে পারতেছি না যে এরা আমার সেই সোনা বাজান। আল্লাহ, তুমি আমারে এত বড় কষ্ট কেন দিলা?’

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়িতে তাদের মরদেহ পৌঁছালে কথাগুলো বলে আহাজারি করছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুন।

তার দুই ছেলে সুমন ও মোহন সৌদি আরবে সোফা তৈরির কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছেন। 

গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া ৯ জনের মরদেহ গতকাল বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে। এর মধ্যে সাতজনের বাড়িই নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রশাসনের সহায়তায় রাত দেড়টার দিকে মরদেহগুলো নওগাঁর আত্রাইতে আসে। পরে আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠে নিহত সাতজনের একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। 

জানাজায় নওগাঁ-৬ আসনের সদস্য রেজাউল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

সৌদি আরব থেকে মরদেহ আসা নওগাঁর সাতজন হলেন- আত্রাই উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, একই গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী ও সুমন আলী এবং বজলুর রহমানের ছেলে কলিমুদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং উপজেলার পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।

গণ্ডগোহালী, উদনপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামগুলোর সড়কে ঢুকতেই কান্নার রোল পড়ে যায় চারদিকে। লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স দেখে আর্তনাদে ভেঙে পড়েন স্বজনরা। কেউ দুই হাত তুলে সন্তানের বেহেস্ত কামনা করছিলেন, কেউ আবার শেষবারের মতো সন্তানের নাম ধরে ডাকছিলেন। প্রিয় মানুষটির মরদেহ ফিরে পেলেও স্বজনদের মধ্যে ছিল না কোনো স্বস্তি। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন মরদেহের দিকে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলেও শেষ দেখাটা যে এমন হবে, তা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউ।

মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে দুই ছেলের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরে ময়না খাতুন বলেন, আমার ছেলে বলত, ‘মা আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরব। দেশে এসে বাড়ির কাজ শেষ করব। তোমাকে নিয়ে একসঙ্গে সুখে থাকব’। আমার দুনিয়া থেকে সবকিছুই চলে গেল। আমার আর কিছু থাকল না। আমার স্বামীও প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে অনুরোধ, সরকার যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।

গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত কলিমউদ্দীনের মা কারিমা বলেন, বিদেশে গেল আমাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাইতে, আর আমরা পাইলাম ওর লাশ! কয়দিন পর পর শুনি আগুনে কত মা-বাপের কোল খালি হয়। ওখানকার ফ্যাক্টরিতে কোনো নিরাপত্তা ছিল না কেন? আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়।

গণ্ডগোহালী গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, এর আগে এতগুলো মরদেহ কখনও দেখিনি। এ ঘটনার পর থেকেই আমাদের গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে ছেলেগুলো মারা গেল, তারা সবাই পরিবারের উপার্জনের একমাত্র উৎস ছিল। তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও ভেঙে পড়েছে।

উদনপৈ গ্রামের নিহত ফরিদের মা সাফিয়া খাতুন বলেন, ছেলেটাই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। পেটের টানেই তারে পাঠাইছিলাম দেশের বাইরে। আগুনে সব শেষ হয়ে গেল! এখন আমি এই সংসার নিয়া কোথায় যাব? আমার বুকের মানিকরে তো আর কেউ ফিরায়ে দিতে পারবে না।

ডুবাই গ্রামের সোহেল রানার বাবা বাদল তরফদার বলেন, একটা সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় দেশের বাইরে পাঠিয়েছিলাম। এখন আমার তো আর কেউ নাই রে বাবা! ছেলেটাকে বুকে ধরে কষ্ট করে মানুষ করছিলাম। ছেলেটা ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে ছিল? আমার বুড়া বয়সের লাঠিটারে কে কাইড়া নিল রে আল্লাহ।

এদিকে নওগাঁর নিহত ১২ জনের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের মরদেহ কবে দেশে ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্বজনেরা। 

আত্রাই উপজেলার মধ্যবোয়ালী গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি চোখ মুছতে মুছতে বলেন, কতদিন ধরে ছেলের মুখটা দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি। আমার ছেলের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এ জন্য পরে আসবে। শেষবার একটু ছুঁয়ে দেখতে পারব না? সরকারের কাছে আবদার, আমার ছেলের লাশ যেন দ্রুত নিয়ে আসে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, একসঙ্গে নওগাঁর ১২ জন বাসিন্দা সৌদিতে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। এসব সহযোগিতা নিহতদের পরিবারে পৌঁছে দেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, অন্য মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে । ডিএনএ মিললেই দ্রুত তাদের মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মনিরুল ইসলাম শামীম/ এসএইচএ