গাইবান্ধার দুইটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নালা, খাল বা ক্যানেল না থাকায় প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন শত শত কৃষক। চলতি আমন মৌসুমের উৎকৃষ্ট সময় পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ জলাবদ্ধতার কারণে ওইসব এলাকার বহু কৃষক এখনও আমন ধান রোপণের উদ্যোগ নিতে পারেননি। ফলে কয়েকশ বিঘা জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন কৃষকরা। এমন বাস্তবতায় নালা বা ক্যানেল খননের দাবিতে এক কৃষক সমাবেশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকরা।
শুক্রবার (২৬ আগস্ট) বিকেল ৫টায় বোয়ালী ইউনিয়নের ‘হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ মাঠে শুরু হওয়া এই কৃষক সমাবেশ চলে রাত ৮টা পর্যন্ত।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বোয়ালী ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় এখনো কয়েকশ বিঘা জমি পানির নিচে তলিয়ে আছে। চলতি আমন মৌসুমের উৎকৃষ্ট সর্বশেষ সময় ছিলো ১৫ আগস্ট, কিন্তু তা পার হলেও এখনো জলাবদ্ধতার কারণে ধান রোপণ করা যাচ্ছে না। অথচ আশেপাশের এলাকায় রোপণের পর কৃষকরা প্রথম দফার সার উপরি প্রয়োগ করছেন।
স্থানীয় কৃষক বক্তারা জানান, চলতি মৌসুমে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় অনেকের বীজতলা তলিয়ে গেছে। তারা অনেক চড়া দামে চারা ক্রয় করে রোপণ করছেন। তারা জানান, শুধু আমন মৌসুমে নয়, ইরি মৌসুমেও সামান্য বৃষ্টিতে পানিতে ডুবে যায় পাকা ধান। তখন কৃষক ঘরে কাঙ্ক্ষিত ফসল তুলতে পারেন না। সে সময়ে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পায়, অনেক সময় অপরিপক্ব ধান কাটতে হয়। গেল বছরেও ইরি মৌসুমেই এই দুর্যোগের মুখে পড়েছিলো এসব এলাকার কৃষকরা, ফলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তারা জানান, সাদুল্লাপুর থেকে আসা একটি নালা তুলসীঘাট হয়ে বোয়ালী ইউনিয়নের শেষ অংশে রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের মৃত কাদের মিয়ার বাড়ির সামনে এসে শেষ হয়েছে। বর্ষায় কয়েকটি ইউনিয়নের পানি ওই নালা হয়ে ভেলাকোপার বিলে এসে পড়ে। এ ছাড়া, শহরের সুন্দরজাহান মোড় থেকে শুরু করে গোবিন্দপুরের পানি এসে পড়ে পাকরিছিড়া ব্রিজের উত্তরের পাথারে। পরে ওইসব পানি বের হয়ে না যেতে পারায় ভেলাকোপা ও পাকরিছিড়া ব্রিজের উত্তর-দক্ষিণের পাথারে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এই জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়ে রামচন্দ্রপুর ও বোয়ালী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকায়। ফলে এসব এলাকার কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই আসছেন।
এ ছাড়া, কৃষকদের অভিযোগ, বোয়ালী ইউনিয়নের রাধাকৃষ্ণপুরে পানি প্রবাহের পথে বেসরকারি সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশনের একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ ও অপরিকল্পিতভাবে পুরো পাথারজুড়ে প্রাচীর নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত এসকেএস সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছে। তারা পানি নিষ্কাশনের জন্য পাঁচটি পাইপ স্থাপন করলেও ভারা বর্ষায় পানি প্রবাহের জন্য তা যথেষ্ট নয়। ফলে জলাবদ্ধতার একটি বড় কারণ এসকেএস-এর এই সীমানা প্রাচীর দায়ী বলেও জানান কৃষকরা।
কৃষক সংগ্রাম কমিটির সদস্য সবুজ মিয়া তার বক্তব্যে বলেন, এসকেএস ইন সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করার ফলে এবং বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ সৃষ্টির কারণে অত্র এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। যার ফলে কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করতে হবে। অবিলম্বে খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলেন, প্রতি বছর দোগাছি (বলা) দিতে কৃষকদের অনেক বেশি খরচ হয়। অনেক সময় দুই দফা রোপণ করেও এক কেজি ধান পাওয়া যায় না, পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়। অথচ এই এলাকার দুই পাশেই নালা আছেই। কেবল মাঝে প্রায় দুই কিলোমিটার নালা খনন হলেই এখানে আমন, ইরি ও বর্ষালীসহ তিন ফসলি চাষাবাদ করার সম্ভাবনা আছে।
স্থানীয় কৃষকরা আরো অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে সংশ্লিষ্টদের কাছে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়েছে কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে ক্ষতির বোঝা টানতে হচ্ছে এখানকার কৃষকদের।
তাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং কৃষক বাঁচাতে এসব এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে খাল কিংবা ক্যানেল নির্মাণ করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেন নেতাকর্মীরা।
কৃষক সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে ও সংগঠনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা শফিউল হকের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যান্যের মাঝে বক্তব্য রাখেন— বোয়ালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামাল হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন, আসাদুজ্জামান মিলন ও জাহিদুল হক। এ সময় বোয়ালী ও রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কৃষকরাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, এর আগে গত টানা কয়েকদিন সন্ধ্যার পর করে এসব এলাকার আশেপাশের কয়েকটি স্থানে সংক্ষিপ্ত পথসভা করা হয় এবং আজ দুপুর থেকে আধাবেলা মাইকিং করে সমাবেশের খবর প্রচার করা হয়।
মাসুম বিল্লাহ/এসএএস
