ফেনী জেনারেল হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসায় অবহেলায় নাসিমা আক্তার (৪৫) নামের এক নারীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সত্যতা মেনে নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসায় গাফিলতির কথা স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোবারক হোসেন দুলাল এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
নিহত নাসিমা আক্তার ফেনী সদর উপজেলার মধ্যম ধলিয়া গ্রামের আবদুল হামিদ মৌলভী বাড়ির আহমদ করিমের স্ত্রী।
নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য ঘরের বাইরে বের হন নাসিমা। এ সময় দরজার সামনে এলে একটি সাপে ছোবল দেয়। তবে সাপটির পরিচয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন। এরপর রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে নাসিমাকে চিকিৎসার জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বামী। প্রথমে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানে তার রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে প্রায় ২০ মিনিট পর্যবেক্ষণ করা হয়। ওই সময় তার মধ্যে বিষক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ ছিল না বলে জানান জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স আলো রানী নাথ। পরে রক্ত জমাট বাঁধলে পরবর্তী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়।
নাসিমার স্বামী আহমদ করিম বলেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা ২৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার আমার স্ত্রীকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা না দিয়ে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করেন। চিকিৎসককে বারবার সাপে কামড়ানোর বিষয়টি বলা হলেও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মেডিসিন বিভাগে নেওয়ার পর একজন নার্সের মাধ্যমে শুধু স্যালাইন দেওয়া হয়। শয্যা না থাকায় তাকে মেঝেতে রাখা হয়। পরে বিষক্রিয়ায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ভর্তির অল্প সময়ের মধ্যেই নাসিমার মৃত্যু হয়।
ওই রাতে মেডিসিন ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আলম বলেন, রাত আনুমানিক ৩টা ৩৫ মিনিটে রোগীকে ওয়ার্ডে আনার পর চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ওষুধ ও সেবা দেওয়া হয়েছে। ক্রিটিক্যাল রোগী হিসেবে তাকে নজরদারিতেও রাখা হয়েছিল। রোগীর স্বামীকে নাসিমা যেন ঘুমিয়ে না পড়েন এবং কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে নার্সদের জানাতে বলা হয়েছিল। ২৬ শয্যার ওই ওয়ার্ডে সেদিন ৯০ জনের বেশি রোগী ভর্তি ছিলেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকলেও ক্রিটিক্যাল রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুক্রবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার দিকে রোগীর স্বামী এসে জানান, নাসিমা চোখ খুলছেন না। তখন সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে গিয়ে চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। পালস পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রৌকন উদ দৌলা বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আইসিইউতে দুটি ভাইল রাখা ছিল। এছাড়া অন্তত ২০ জন রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ভেনম হাসপাতালে মজুত রয়েছে।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই রোগীকে হাসপাতালে আনার সময় স্বজনরা সাপের কামড়ের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি। শুরুতেও রোগীর মধ্যে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি। তাই তাকে পর্যবেক্ষণের জন্য মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়। পরে সেখানেই বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং রোগীর মৃত্যু হয়।
ওই রাতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. চিরঞ্জীব সরকারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোবারক হোসেন দুলাল বলেন, সাপে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সবসময় বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায় না। লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা হয়। নাসিমার ক্ষেত্রে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার কথা চিকিৎসাপত্রে উল্লেখ করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির পর ওয়ার্ডে রোগীর অবস্থার অবনতি হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি চিকিৎসককে জানাননি। এজন্য সঠিক সময়ে অ্যান্টিভেনম দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় নার্সের গাফিলতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারেক চৌধুরী/এমএন
