এক বছর পরই অবসরে যাওয়ার কথা ছিল প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকা গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে আর পৌঁছানো হলো না। রাজধানীতে ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে সড়কে পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে তার।
নিহত রনজিনা পারভীন (৫৫) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন।
জানা গেছে, চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে বাসে করে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিনা পারভীন। শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকায় পৌঁছে তিনি রিকশাযোগে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। পথে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে একটি মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারীরা রিকশা পাশ থেকে তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে ভারসাম্য হারিয়ে রনজিনা পারভীন রিকশা থেকে সড়কে পড়ে যান। মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্বামী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে রনজিনা পারভীন বগুড়া শহরের পিটিআর মোড় এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্বামী মতিউর রহমান মতিন একজন ব্যবসায়ী।
রনজিনা পারভীনের ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, ১৯৯১ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন আমার বোন। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। চাকরিজীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে, তা কেউ ভাবতেও পারেননি। আর মাত্র এক বছর পরই তার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
তিনি আরও বলেন, চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে রনজিনা পারভীন দ্বিতীয়। বোনের মরদেহ বগুড়ায় এসেছে। দুপুরে জানাজা শেষে গাবতলী উপজেলার দাড়াইল পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
নিহতের স্বজনরা জানান, রনজিনা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যরা গভীর শোকে মুহ্যমান। বিশেষ করে তার একমাত্র কিশোরী মেয়ে মায়ের মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। মাকে হারিয়ে সে ভেঙে পড়েছে।
বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ও রনজিনা পারভীনের দীর্ঘদিনের সহকর্মী রিজবোনা আক্তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটির দিনে আমরা ছয়জন শিক্ষিকা স্কুলে গিয়ে মিলাদ মাহফিলে অংশ নিই। পরে তার অনুরোধে সবাই মিলে তার মোবাইল ফোনে একটি গ্রুপ ছবি তুলি। ছবিটি এখনো তার মোবাইলেই আছে।
তিনি বলেন, সেদিন তিনি বলেছিলেন- শুক্রবার রাতে চোখের ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবেন। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে স্কুল থেকে বের হয়ে যে যার বাড়িতে ফিরে যাই। পরে আর কোনো কথা হয়নি। কিন্তু আজ খবর পেলাম, তিনি আর নেই।
রিজবোনা আক্তার বলেন, তিনি শুধু আমাদের প্রধান শিক্ষিকাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক, সহকর্মী এবং একজন দক্ষ শিক্ষানুরাগী মানুষ। তার এমন মৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, রনজিনা পারভীন অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকা ছিলেন। তার মতো শিক্ষক এই সময়ে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর।
গাবতলী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, আমার কাছে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। আমি জানতাম, তার পায়ে চোট লেগেছিল এবং সেখান থেকে চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এজন্য তিনি ঢাকায় চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে, তা কল্পনাও করতে পারিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত শোকাহত ও মর্মাহত। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে তিনি সবার কাছে একজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
আব্দুল মোমিন/আরএআর
