পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জনবল সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারী পদে। জেলার ২০৪টি অনুমোদিত স্বাস্থ্য সহকারী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৫ জন। শূন্য রয়েছে ১২৯টি পদ।
স্বাস্থ্য সহকারীরাই দুর্গম পাহাড়ি ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত গ্রামে টিকাদান, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, রোগী শনাক্তকরণ এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় এসব কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে। সীমিত জনবল দিয়ে সেবা চালু রাখতে গিয়ে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদেরও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য সহকারীর পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, উপসহকারী মেডিকেল অফিসার, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, রেডিওলজিস্টসহ বিভিন্ন পদেও জনবল সংকট রয়েছে। ফলে জেলার হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারছে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আওতায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিভাগের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের বিধান রয়েছে। এর আওতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে সিভিল সার্জন কার্যালয় ও এর আওতাধীন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ১২০টি শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জেলা পরিষদ। এর মধ্যে ১১২টি পদই ছিল স্বাস্থ্য সহকারীর।
এ ছাড়া সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও ড্রাইভার পদেও নিয়োগের কথা ছিল।
তবে নিয়োগে কোনো ধরনের কোটা ব্যবহার করা হবে—এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালটি ২০২৩ সালে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সে অনুযায়ী জনবল দেওয়া হয়নি। হাসপাতালটি এখনো ৫০ শয্যার চিকিৎসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। নার্স রয়েছে ১০০ শয্যার।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে উপসহকারী মেডিকেল অফিসারেরও বড় ঘাটতি রয়েছে। ৪৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৪ জন। অর্থাৎ ২৪টি পদই শূন্য। খাগড়াছড়ির সরকারি হাসপাতালগুলোতে রেডিওলজিস্ট সংকটও প্রকট। জেলায় ৯ জন রেডিওলজিস্ট থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র চারজন। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির সঙ্গে এই সংকট যুক্ত হওয়ায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে রোগ নির্ণয়ের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক রোগীকে।
খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে দুটি এক্স-রে মেশিন রয়েছে। তবে জনবল না থাকায় একটি মেশিনই চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে।
হাসপাতালের রেডিওগ্রাফি বিভাগের ইনচার্জ নবেল চাকমা বলেন, প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন রোগীর এক্স-রে করতে হয়। দুটি এক্স-রে মেশিন থাকলেও জনবল না থাকায় একটি অব্যবহৃত থাকছে।
জনবল সংকটের পাশাপাশি ল্যাবরেটরি সেবাতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের ল্যাব ইনচার্জ টেকনোলজিস্ট চয়ন চাকমা বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে রক্ত পরিসঞ্চালনের কিট সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে রোগীদের রক্ত দেওয়ার ব্যয় বেড়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা গেলে সরকারি হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিপল বাপ্পি চাকমা বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও ৫০ শয্যার চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। নার্স রয়েছে ১০০ শয্যার। জটিল রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।
তিনি জানান, জেলায় আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে জটিল রোগীদের বাধ্য হয়ে অন্যত্র রেফার করতে হয়।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন রতন খীসা বলেন, খাগড়াছড়িতে স্বাস্থ্য খাতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বড় অংশ পদই শূন্য। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণেও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পাওয়ার পর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে দায়ের করা একটি রিটের কারণে তা সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে রিটের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মোশাররফ হোসেন বলেন, জেলার স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাগড়াছড়ির বাইরে রাঙামাটির দুটি উপজেলার মানুষও চিকিৎসার জন্য খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে আসেন। পাশাপাশি পর্যটন এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনাজনিত রোগীর চাপও থাকে।
তিনি বলেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জেলা পরিষদ স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেবে। ইতোমধ্যে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করা হয়েছে। সেখানেও জনবল সংকটের কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
চিকিৎসকদের হাসপাতালে অনুপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে জানিয়ে মোশাররফ হোসেন বলেন, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে জেলা পরিষদ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
জেলা পরিষদের সদস্য খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার বলেন, আমরা জেলার স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুততম সময়ে আইনি জটিলতা সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব। স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বিভাগের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খাগড়াছড়ির স্বাস্থ্য বিভাগের সামগ্রিক সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীর শূন্য পদ পূরণ।
তাই দ্রুত নিয়োগ শেষ করে কর্মস্থলে পদায়ন এবং কর্মরত জনবলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি জনপদের মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য সহকারীসহ প্রয়োজনীয় সব জনবল দ্রুত নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
মোহাম্মদ শাহজাহান/এএমকে
