ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড। অন্য শিশুদের কেউ মায়ের কোলে, কেউ বাবার হাত ধরে আছে, কেউ আবার হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আপন মনে খেলছে। সেই ওয়ার্ডেরই একটি বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে সাড়ে চার বছরের রায়াত। ব্যথায় কাতর শিশুটির চোখেমুখে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব। ফুলে গেছে দুই চোখ ও পেট। কিছুক্ষণ পরপরই কষ্টে ছটফট করছে সে।
বিছানার পাশেই বসে আছেন মা রুপালী বেগম। কোলে আরেক সন্তান। এক হাতে ছোট শিশুকে সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে বারবার তাকাচ্ছেন অসুস্থ ছেলে রায়াতের দিকে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছছেন তিনি। মায়ের চোখের পানি যেন বলে দিচ্ছিল- সন্তানের কষ্টের কাছে একজন মা কতটা অসহায়।
রায়াতের কাছে গিয়ে প্রতিবেদক তার অসুস্থতার কথা জানতে চাইলে শিশুটি কষ্টের মধ্যেও বলে ওঠে, আমার কিডনির সমস্যা, খুব ব্যথা করে। আমি বাঁচতে চাই। আমাকে সাহায্য করুন, আমাকে বাঁচান আংকেল। সুস্থ হয়ে হাফেজ হতে চাই।
সাড়ে চার বছরের শিশুর মুখে এমন আকুতি শুনে মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে শিশু ওয়ার্ডের পরিবেশ। পাশে থাকা মা রুপালী বেগমের চোখে তখন পানি। ছেলের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে যান তিনি।
এই বয়সেই রায়াতের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে হাসপাতাল, ওষুধ, ইনজেকশন আর অসহ্য ব্যথা। যে বয়সে তার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাকে বলতে হচ্ছে ‘আমি বাঁচতে চাই।’
রায়াতের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের নবগঠিত রুহিয়া উপজেলার কশালগাঁও-রেলস্টেশন এলাকায়। দিনমজুর নূর আলম ও রুপালী বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে রায়াত দ্বিতীয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর আগে রায়াতের দুই কিডনিতে পানি জমে। এরপর থেকেই শুরু হয় তার কষ্ট। মাঝেমধ্যে হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা ওঠে। তখন ফুলে যায় তার চোখ ও পেট। ব্যথায় কাতরাতে থাকে শিশুটি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা উঠলে রায়াতকে বেশ কয়েকটি ইনজেকশন দিতে হয়। প্রতিটি ইনজেকশনের দাম প্রায় ৬ হাজার টাকা। ফলে একবার ব্যথা উঠলেই ইনজেকশনের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। দিনমজুর বাবার জন্য সেই টাকা জোগাড় করা যেন আরেক যুদ্ধ।
চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানিয়েছেন, রায়াতের বয়স ১৮ বছর না হওয়া পর্যন্ত বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব নয়। ফলে আপাতত ব্যথা উঠলে ওষুধ ও ইনজেকশনের মাধ্যমে তার কষ্ট কমাতে হবে।
প্রায় এক মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি রায়াত। দিনের পর দিন একই বিছানায় কাটছে তার সময়। কখনো ব্যথা কিছুটা কমে আসে, আবার হঠাৎ করেই শুরু হয় তীব্র যন্ত্রণা। ইনজেকশন দিলে কিছুটা স্বস্তি পায় রায়াত। কিন্তু ইনজেকশন না দিতে পারলে ব্যথায় কাতরাতে থাকে। ফুলে যায় চোখ ও পেট।
রায়াতের বাবা নূর আলম পেশায় দিনমজুর। নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই তাদের। সরকারি জমি লিজ নিয়ে সেখানে বসবাস করছে পরিবারটি। ছেলের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এরই মধ্যে পরিবারের চারটি গবাদিপশু বিক্রি করেছেন নূর আলম। করেছেন ধারদেনাও। যতটুকু সামর্থ্য ছিল ছেলের চিকিৎসার পেছনে ব্যয় করেছেন। কিন্তু দেড় বছর ধরে চিকিৎসা চালাতে চালাতে সেই সামর্থ্যও এখন প্রায় শেষ। দিনমজুরি করে যে টাকা পান, তা দিয়ে সংসারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন। তার ওপর অসুস্থ ছেলের ওষুধ, ইনজেকশন ও চিকিৎসার খরচ। ফলে একদিকে ছেলের কষ্ট, অন্যদিকে অর্থের চিন্ত দুই দিক থেকেই যেন চাপে পড়েছে পরিবারটি।
প্রতিবেশী জুয়েল, শিউলী ও রাহাত ঢাকা পোস্টকে জানান, রায়াতের পরিবার খুবই অসচ্ছল। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে এরই মধ্যে পরিবারের অনেক কিছু বিক্রি করতে হয়েছে। দিনমজুরি করে সংসার চালানো নূর আলমের পক্ষে ছেলের চিকিৎসার এত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রায়াত দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার বাবা-মা মানসিক ও আর্থিকভাবে চরম সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তারা রায়াতের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।
রুপালী বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। ও যখন ব্যথায় কাঁদে, তখন মনে হয় আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু টাকা না থাকলে কীভাবে চিকিৎসা করাব, সেটাই বুঝতে পারছি না। ছেলের চিকিৎসার জন্য যা কিছু ছিল, অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে। এখন ছেলেকে সুস্থ করার জন্য মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
রায়াতের বাবা নূর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলের কষ্ট চোখের সামনে দেখতে পারি না। ব্যথা উঠলে ও যখন কাঁদে, তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগে। ছেলের চিকিৎসার জন্য যা কিছু ছিল, অনেকটাই বিক্রি করেছি, ধারদেনাও করেছি। এখন আর সামর্থ্য নেই। আমি দিনমজুর মানুষ, প্রতিদিন কাজও জোটে না। ছেলেটাকে বাঁচাতে সবার সহযোগিতা চাই।
রুহিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলাউদ্দীন বলেন, শিশু রায়াতের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে সহায়তার জন্য আবেদন করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব, আমরা তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।
রায়াতের পরিবারের সঙ্গে ০১৭৫২১০৭২৫৭ (বিকাশ-নগদ) এই নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
রেদওয়ান মিলন/আরএআর
