তিন মাসের বন্ধ থাকায় সজীবতা ফিরেছে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির। মানুষের আনাগোনা না থাকায় বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধের কারণে নির্ভয়ে চলাচল করছে বনের বাঘ, হরিণ, কুমির, বানরসহ বনে থাকার নানান প্রজাতির পশুপাখি ও সরীসৃপ প্রাণী। একই সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন ছোট বড় খালে, নদীতে বেড়েছে মাছের উপস্থিতি। ঘন হয়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়াসহ নানান প্রজাতির বনজ গাছ।
জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ ও সব ধরনের বনজসম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় আবারও সুন্দরবনে প্রবেশ করবেন জেলে, বাওয়ালি, পর্যটক ও মৌয়ালরা। এরই মধ্যে তিন মাসের অবরোধের সুফল দৃশ্যমান হয়েছে বলে দাবি বন বিভাগের।
বন্ধ থাকাকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক দেখা মিলেছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। কখনও খালের পাড়ে, আবার কখনও বনের ভেতরে। বনের নানা প্রান্তে হরিণের পাল, বানর, লাল কাঁকড়া ও বন্য শূকরের অবাধ বিচরণও দেখা যাচ্ছে।
বন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন মাস মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকায় বন্যপ্রাণীরা পেয়েছে নির্ভয়ে চলাচলের সুযোগ। একই সময়ে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননও হয়েছে নির্বিঘ্নে। ফলে বনের খালগুলোতে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে অবরোধ চলাকালে বন অপরাধের আশঙ্কা থাকায় বন বিভাগকে জোরদার করতে হয়েছে টহল। জোয়ার-ভাটার সময় হিসাব করে ২৪ ঘণ্টাই সুন্দরবনে পাহারা দিয়েছেন বনকর্মীরা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে স্মার্ট পেট্রোলিং।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, অবরোধ বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের থেকে বন্ধ সময়ে টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বন অপরাধ কমেছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং করা হলেও তিন মাসের অবরোধ চলাকালে তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়। এতে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছে বন বিভাগ।
মৌয়াল গোবিন্দ দেবনাথ বলেন, তিন মাস বনে যেতে না পারায় অনেক কষ্টে সংসার চালাতে হয়েছে। ধার দেনা করে সংসার চালিয়েছি। সুন্দরবনই আমাদের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আমরা আবার বনে গিয়ে মধু সংগ্রহ করতে পারব। নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে হয়ত এবার আমরা বনে গিয়ে একটু বেশি মধু আহরণ করতে পারব বলে আশাবাদী।
শরণখোলার জেলে মইনুল তরফদার বলেন, তিন মাস বন বন্ধ থাকায় বনে যেতে পারিনি। এ সময় জাল নৌকা সব মেরামত করে রেখেছি। বন্ধ খুললেই বনে যাব আশা করি এইবার আগের তুলনায় বেশি মাছ পাব।
পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধাজ্ঞা থাকে। নিষেধাজ্ঞার সময় টহলও বাড়ানো হয়। এবারও অবরোধের সুফল হিসেবে বনে বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে রয়েছে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি বন বিভাগের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধলাখ বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করেন। সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে আসছে বন বিভাগ।
শেখ শামীম হাসান/এসএইচএ
