বিজ্ঞাপন

মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুষ, ছেলে তৈরি করল ‘ঘুষ ডট সাইট’

মায়ের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে ঘুষ, ছেলে তৈরি করল ‘ঘুষ ডট সাইট’

মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুষের দাবির মুখে পড়েছিল পরিবার। নিজের পাসপোর্ট তৈরিতেও একই অভিজ্ঞতা। সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদকে ভাবিয়েছে ভিন্ন কিছু করার। তার হাত ধরে তৈরি হয়েছে ‘ঘুষ ডট সাইট’। যেখানে পরিচয় গোপন রেখে সাধারণ মানুষ জানাতে পারছে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা।

ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আমিনা খাতুনের ছেলে শাহেদ শরীফ আহমেদ। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় মারা যান আমিনা। তার চাকরির বয়স হয়েছিল ১৩ বছর। 

মৃত্যুর পর আমিনার প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল পরিবারের। কিন্তু সেই টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক দপ্তরে ঘুষের দাবির মুখে পড়তে হয় তাদের। ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা— সব মিলিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতেই ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবারটি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ টাকা এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৮ লাখ টাকা পেতে শিক্ষা অফিসের সংশ্লিষ্টরা আরও ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করছেন বলে অভিযোগ পরিবারের। টাকা না দিলে ফাইল আর এগোবে না এমন কথাও জানানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।

ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকেন শাহেদ শরীফ আহমেদ। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে ক্যামব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে সে। পড়াশোনার পাশাপাশি ওয়েবসাইট ডেভেলপমেন্ট শেখার আগ্রহ থেকেই কোডিংয়ের সঙ্গে তার পরিচয়। কিন্তু ‘ঘুষ ডট সাইট’ তৈরির পেছনে কেবল প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল না, ছিল নিজের জীবনে দেখা এক তীব্র অভিজ্ঞতা।

শাহেদ বলে, আম্মুর পেনশনের ফাইল আটকে রেখে লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া দেড় বছর আগে ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য পাসপোর্ট করতে গেলে ফাইল আটকে রেখে ১৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার ৩ ঘণ্টার মধ্যে কাজ হয়ে যায়। এই ক্ষোভ থেকেই ওয়েবসাইটটি বানাই।

দুই ঘণ্টার কোডিং থেকে হাজারো অভিযোগ

একটি ভারতীয় ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয় শাহেদ। এরপর মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে তৈরি করে ‘ঘুষ ডট সাইট’-এর প্রাথমিক কাঠামো। পরে বন্ধু ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কেনা হয়। ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি লাইভ করা হয়। পুরো উদ্যোগ বাস্তবায়নে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ ডলার। 

শুরুতে অবশ্য শাহেদের ধারণাও ছিল না, সাইটটি এত দ্রুত মানুষের নজরে আসবে। সে ভেবেছিল, এটি হয়তো নিজের সিভিতে যুক্ত করার মতো একটি প্রকল্প হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়েবসাইট চালুর মাত্র ৯ দিনের মাথায় শনিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে জমা পড়ে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা। অভিযোগের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বর্তমানে চার সদস্যের একটি পর্যালোচনা দল সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করছে। ড্যাশবোর্ড থেকে ফিল্টার করার পর অভিযোগগুলো ওয়েবসাইটে লাইভ করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীর পরিচয় থাকবে গোপন

‘ঘুষ ডট সাইট’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা। কারণ অভিযোগ জানাতে গিয়ে যেন কোনো ভুক্তভোগী নতুন করে আইনি বা ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে না পড়েন, সে বিষয়টি মাথায় রেখেছেন উদ্যোক্তারা।

শাহেদ বলে, এখন পর্যন্ত আলহামদুলিল্লাহ কোনো হুমকি পাইনি। শুরুতে সাইটটি এত ভাইরাল হবে তা ভাবিনি, ভেবেছিলাম সিভিতে যুক্ত করব। বর্তমানে আইনি ঝুঁকি এড়াতে ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় বা নির্দিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে লিগ্যাল টিম গঠন বা সরকারি সমর্থন পেলে পূর্ণ তথ্য যুক্ত করা হবে।

সে বলে, আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বচ্ছতা তৈরি করা। সরকারের টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা সবাইকে জানানো। সোজা কথায় ঘুষের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা, যেন সাধারণ মানুষ সেবা পেতে কোনো বাধার মুখে না পড়ে।

শাহেদের এই উদ্যোগে সবচেয়ে বড় সমর্থন এসেছে তার বাবার কাছ থেকেই। শাহেদের বাবা শরিফুল ইসলাম শামীম আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। স্ত্রী আমিনা খাতুনের মৃত্যুর পর সরকারি প্রাপ্য টাকা তুলতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, সেটি তার কাছে এখনো কষ্টের।

শরিফুল ইসলাম শামীম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সরকারি টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের মুখে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলেছি। কিন্তু বাকি ১০ লাখ টাকা পেতেও ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিস মিলে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি জেদ ধরেছি ঘুষ না দিয়েই টাকা তুলব। ছেলের এই উদ্যোগে আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী মো. মজিবুর রহমান ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, কেউ আমার কাছে এলে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি। কাগজ নিয়ে এলে দ্রুত স্বাক্ষর করিয়ে দিই।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মনিকা পারভীন বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা আমাকে কিছু জানাননি। কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। একই সঙ্গে তিনি বকেয়া টাকা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ আমাদের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য এলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপ নেবে।

টিআইবি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহ-সভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষের কারণে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পদে পদে ছড়িয়ে পড়া ঘুষের চিত্র এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সরকার যদি প্রযুক্তিনির্ভর এই স্বচ্ছতার পদক্ষেপগুলো কাজে লাগায়, তবে সাধারণ মানুষ চরমভাবে উপকৃত হবে।

সাখাওয়াত সুমন/আরএআর

বিজ্ঞাপন