কুড়িগ্রামের উলিপুরে ওয়াপদা বাঁধের স্লোপে টিনের ছাপরায় বসবাস করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আলেকজন বেওয়া (৫৬)। স্বামী-সন্তান ও স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এই নারীর দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তা, অভাব আর নিঃসঙ্গতায়। পেলে খান, না পেলে উপোস থাকেন। ভাঙাচোরা টিনের ছাপরায় প্রচণ্ড গরম ও ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কাটে তার রাত।
বিবাহিত তিন মেয়ে ঢাকায় স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করলেও মায়ের কোনো খোঁজখবর রাখেন না বলে অভিযোগ আলেকজনের। প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী তাকে মৌখিকভাবে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর থেকেই ভিক্ষাবৃত্তি করে কোনোভাবে জীবন কাটছে তার। অথচ এখনো পাননি বয়স্ক ভাতা বা কোনো সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা। জনপ্রতিনিধি, গ্রামের মানুষ সবাই তার অসহায়ত্বের কথা জানলেও অন্ধ প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় না আলেকজনদের মত একাকী সংগ্রামরত নারীদের ভূমিহীন জীবনের করুণ কাহিনী!
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের তিস্তা নদীঘেঁষা চর বজরাটারী পাড়া গ্রামে ওয়াপদা বাঁধের খাসজমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে আলেকজনের। তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি ও স্বজনদের হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এখানেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
জানা গেছে, দিনাজপুর শহরের বিদ্যুৎ অফিসের পাশের একটি বস্তিতে আলেকজনের বিয়ে হয়েছিল। সংসারে জন্ম নেয় তিন কন্যাসন্তান। মেয়েরা বড় হওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি শুরু করেন। সেখানেই তাদের বিয়ে হয়। তবে আলেকজনের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। ছেলে সন্তান জন্ম দিতে না পারায় তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
এরপর কিছুদিন ঢাকায় মেয়েদের কাছে থাকলেও একপর্যায়ে তারাও মায়ের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন বলে জানান আলেকজন। বাধ্য হয়ে ঢাকার পাট চুকিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। পরে আত্মীয়-স্বজনদের কাছে আশ্রয়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। স্বজনরাও তাকে নিজেদের জন্য বাড়তি বোঝা মনে করে দূরে সরিয়ে দেন। এরপর থেকেই চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের পাশে ভাঙাচোরা ছোট্ট একটি টিনের ছাপরায় বসবাস করছেন আলেকজন বেওয়া। ঘরের ভেতর অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্রে ঠাসা। নড়াচড়া করার মতোও তেমন জায়গা নেই। কুড়িয়ে পাওয়া বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়েই ঘরটি ভরিয়ে রেখেছেন তিনি। এক পাশে লাকড়ি রাখার মাচা, অন্য পাশে তিন পায়া একটি চৌকি। বাঁশ দিয়ে কোনো রকমে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে চৌকি ও টিনের চালা।
চারদিকে টিন দিয়ে ঘেরা থাকায় গরমের সময় ঘরটির ভেতর যেন আগুনের উত্তাপ ছড়ায়। কয়েক মিনিট অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঝড়ো বাতাস উঠলে টিনের চালা এদিক ওদিক দুলতে থাকে। তখন ভয়ে ঘর ছেড়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয় আলেকজনকে। এমন অসহায়ভাবেই দিন আর রাত কাটছে তার।
নিজের দুর্বিষহ জীবনের কথা উদাস দৃষ্টিতে আলেকজন বেওয়া বলেন, ‘প্রথমে বাপে, তারপর ছাওয়ারা মোক ঘর থাকি বাইর করি দিলে। এটে ভাই-ভাবীরাও নিলে না। মুই এলা কোটে যাং? একটা করি রাইত কাটপের চায় না। চোখ দিয়া ঝরঝর করি পানি পরি বিছানা ভাসি যায়। এলা কানবের চাইলেও কানবের পাং না। চোখ দিয়া পানি বেড়ায় না। সউগ পানি বের হয়া গেইছে। পেটে খায় তাই বাঁচি আছি। তোমরা এই দুঃখ শুনি কী করবেন?’
প্রতিবেশী মান্নান মিয়া বলেন, মহিলাটা খুব কষ্টে আছে। ঘর-দুয়ার নাই, শুধু চালা। ঝড়-বৃষ্টি আর বাতাস হলে দৌড়াদৌড়ি করে অন্যের বাড়িতে যায়। দিনের বেলা বাইরে থাকে। রাত হলে খুব কষ্ট হয়। গরমে থাকা যায় না। খুব কষ্ট করে থাকে।
প্রতিবেশী কহিনুর বেগম বলেন, মহিলার কপালটা খুবই খারাপ। ভাইয়েরা নেয় না, বেটিরাও নেয় না। স্বামী তো তালাক দিয়া বের করে দিয়েছে। তার আইডি কার্ডও ছিঁড়ে ফেলাইছে। ফলে বয়স্ক ভাতা বা সরকারি কোনো ভাতাই পায় না।
আলেকজনের দূরসম্পর্কের ভাতিজা সাইফুল বলেন, আমার ফুপুরা ৬-৭ বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। তার বাপ-মা মারা গেছেন। ভাইয়েরা আছে, তারাও দিনমজুরি করে খায়। গ্রামের লোকজন চাঁদা তুলে একটা টিনের চালা করে দিয়েছে। ভিক্ষা করে যা পায়, তা দিয়েই চলে। এখন আপনারা যদি সহযোগিতা করেন, তাহলে আমার ফুপুর খুব উপকার হবে।
বিষয়টি নিয়ে উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, আপনাদের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। ওই নারীর কোনো এনআইডি কার্ড নেই। সেহেতু সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বারকে আমরা বলব, তিনি যেন সহযোগিতা করে নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে এনআইডি কার্ডের ব্যবস্থা করেন। এনআইডি হলে আমরা তাকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিধবা ভাতার অন্তর্ভুক্ত করতে পারব।
এ বিষয়ে জানতে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম আরিফের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে মুঠোফোনে খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মমিনুল ইসলাম বাবু/এমএমবি
