বিজ্ঞাপন

রান্না করা মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানাল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

রান্না করা মাংস সবুজ হওয়ার কারণ জানাল নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় রান্নার পর গরুর মাংসের রং লাল থেকে উজ্জ্বল সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনার বৈজ্ঞানিক কারণ ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সংস্থাটি জানিয়েছে, পচন বা কোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার কারণে নয়, বরং ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে উচ্চ তাপে রান্নার ফলে মাংসের ভেতরে থাকা রঞ্জক পদার্থের রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণেই এমনটি ঘটেছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খাদ্য বিশ্লেষক নাজিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

গত ২২ জুলাই খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংসের রং লাল থেকে উজ্জ্বল সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ঘটনায় মাংসের নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আতঙ্ক দেখা দেয়। পরে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ল্যাবরেটরিতে। সম্প্রতি পাওয়া পরীক্ষার প্রতিবেদনে মাংস সবুজ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাইকগাছা পৌরসভা থেকে সংগৃহীত কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ শেষে দেখা গেছে, নমুনায় কোনো ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা পিগমেন্ট উৎপাদনকারী Pseudomonas-ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। একই সাথে মাংসে কোনো পচনশীল দুর্গন্ধ বা আঠালো ভাবও ছিল না, যা নিশ্চিত করে যে এই রং পরিবর্তন কোনো ব্যাকটেরিয়াঘটিত বা পচনের কারণে ঘটেনি।

স্পেক্ট্রোফোটোমেট্রিক পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, ফ্রিজে দীর্ঘক্ষণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে রান্নার সময় উচ্চ তাপের সংস্পর্শে আসার কারণে মাংসের মায়োগ্লোবিন বা হিম-রঞ্জক পদার্থের (Myoglobin/Heme-derived pigments) রাসায়নিক রূপান্তর ও গাঠনিক পরিবর্তন ঘটে। এর ফলেই মূলত মাংস সবুজ রং ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তাই জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক দূরীকরণে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি বিস্তারিত অবহিত করার জন্য ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত এ পরীক্ষার প্রতিবেদনটি জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। 

উল্লেখ্য, গত ২২ জুলাই দুপুরে পৌরসভার মডার্ন বেকারির ২৫ জন কর্মচারী গরুর মাংস দিয়ে পিকনিকের আয়োজন করেন। এ জন্য তারা সকালে পাইকগাছা বাজারের মাংস ব্যবসায়ী ইসমাইলের দোকানে মাংস কিনতে যান। তখন ব্যবসায়ী ইসমাইল জানান, সেদিন জবাই করা গরুর সব মাংস ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তবে তার দোকানের ফ্রিজে ভালো মাংস সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজন হলে সেখান থেকে মাংস দেওয়া যাবে। 

পরে বেকারির কর্মচারী টিটন হোসেন ওই দোকান থেকে চার কেজি মাংস কিনে নিয়ে যান। এরপর পিকনিকের জন্য বাজার-সদাই করে যথারীতি কড়াইতে মাংস রান্না শুরু করেন তারা। রান্নার শেষ পর্যায়ে তারা দেখতে পান, মাংসের স্বাভাবিক লালচে রং পরিবর্তন হয়ে সবুজ রং ধারণ করেছে। বিষয়টি দেখে তারা মাংসসহ কড়াইটি নিয়ে প্রথমে মাংস বিক্রেতা ইসমাইলের দোকানে যান। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করে কড়াইসহ রান্না করা মাংস নিয়ে থানায় হাজির হন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মাংস বিক্রেতা ইসমাইল বলেন, সকালে জবাই করা গরুর মাংস বিক্রি শেষ হওয়ার পর ফ্রিজে সংরক্ষিত মাংস থেকে তিনি ১০ থেকে ১২ জন ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছেন। তাদের মধ্যে শুধু মডার্ন বেকারির কর্মচারীরাই অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, একই মাংস অন্যরাও কিনেছেন, কিন্তু তাদের কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি বলেন, বেকারিতে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিক বা অন্য কোনো কারণে এমন হয়ে থাকতে পারে।

তবে বেকারির কর্মচারীরা বিক্রেতার এ দাবি নাকচ করে জানান, তাদের রান্নায় কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি। তারা মাংসের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের দাবি জানান।

মাংসের এমন অস্বাভাবিক রং পরিবর্তনের ঘটনায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিস্ময় ও কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা পরিষদ চত্বর ও বাজার এলাকায় উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। অনেকেই সেই মাংস দেখতে আসেন। পরে ঘটনাটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

বিষয়টি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীর নির্দেশে মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের খুলনা জেলা কার্যালয় থেকে কাঁচা ও রান্না করা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে প্রধান কার্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। 

মোহাম্মদ মিলন/এমএমবি