বিজ্ঞাপন

রংপুরে ৪ খুনের গভীর তদন্ত চান বাদীপক্ষ, ডোপ টেস্ট নিয়েও প্রশ্ন

রংপুরে ৪ খুনের গভীর তদন্ত চান বাদীপক্ষ, ডোপ টেস্ট নিয়েও প্রশ্ন

রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী ও নিহতদের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তার দাবি, মাদক সেবন করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করলে তারা নেশাগ্রস্ত থাকত। কিন্তু তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়ায় এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পরিকল্পিতভাবে সুস্থ মস্তিষ্কে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। তাই এটিও এখন গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের  কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার সাথে সাক্ষাৎ শেষে গণমাধ্যমে একথা বলেন হত্যা মামলার বাদী ও নিহত শিক্ষকের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।

এ সময় গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, যদি মাদক খেয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাত, তাহলে তারা নেশাগ্রস্ত থাকত। যেহেতু তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি, তাই ভাবা যায় যে সুস্থ মস্তিষ্কে পরিকল্পনা মূলকভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার ছোট ভাইয়ের বাড়ি থেকে তিনি প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামে থাকেন। ফলে ঘটনাস্থল বা স্থানীয়দের সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ ধারণা নেই। এ কারণে এই ঘটনায় কারও নাম উল্লেখ করা কিংবা কাউকে সন্দেহ করার মতো কোনো তথ্যও তার কাছে নেই।

মামলার বাদী হিসেবে তার একমাত্র দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, পুলিশ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের কথা দিয়েছে, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে তারা। আমরা ন্যায়বিচার পেতে তাদের দেওয়া কথার ওপর আস্থা রাখতে চাই।

গ্রেপ্তার দুই যুবকই চারজনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না এবং তাদের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে গণপতির বড় ভাই বলেন, আমি তো শুরু থেকেই বলে এসেছি, এত বড় একটি হত্যাকাণ্ড এই দুই যুবকের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে অনেকে বলে, একজনের পক্ষেও হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব। তারপরও এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তাদের আরও গভীরে গিয়ে তদন্ত করা দরকার। এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খুঁজে বের করতে হবে পুলিশকে।

ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়ে হালকাভাবে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি শেষ করা যাবে না। পুলিশকে আরও গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রেপ্তার দুই যুবক ছাড়াও এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত থাকলে দ্রুত তাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাতিজি জামাই বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী বলেন, আসামিদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি না মেলায় এই হত্যাকাণ্ডের আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরালো হলো। কারণ, তারা মাদকাসক্ত নয়- এতে এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আজ আমরা তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে ডিবি কার্যালয়ে এসে দেখা করে কথা বলেছি। তারা আমাদের কথা দিয়েছেন, সব বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, যতই দিন যাচ্ছে ততই এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য উঠে আসছে। শুরুতে শুনেছিলাম মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড। আজ রিপোর্টে এসেছে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি মেলেনি। তাই আমরা আগে থেকেই বলে এসেছি, এই দুজনের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সে ব্যাপারে গভীর তদন্ত হওয়া দরকার। তবে শেষ পর্যন্ত এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে ন্যায়বিচার দাবি করেন তিনিও।

নিহতের ভাতিজি সপ্তমী চক্রবর্তী বলেন, মাদক নিয়ে আজকের প্রতিবেদনে আমরা কিছুটা বিস্মিত। তবে প্রতিবেদন যেমনই হোক, আমরা এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ন্যায়বিচার চাই।

এদিকে দেরিতে নমুনা সংগ্রহ করার কারণে অভিযুক্তদের ডোপ টেস্টে ‘নট ডিটেক্টেড’ অর্থাৎ ইয়াবা সেবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, এমনটিও হতে পারে কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে তারা জানান, ডোপ টেস্টের নিয়ম, সময়সহ অন্যান্য বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই।

ডোপ টেস্টের ফল সম্পর্কে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে রোববার জেলগেট থেকে দুই আসামির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে ওই নমুনা পরীক্ষা করে এমফিটামিনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডোপ টেস্ট করার জন্যে আমাদের কাছে একটা চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে ওই আসামিদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ডোপ টেস্টটা যেন জেলগেটে করা হয়, সেরকম একটা অনুরোধ আমাদেরকে করা হয়। সেটার প্রেক্ষিতে আমরা এখান থেকে দুইজন টেকনোলজিস্ট দিয়ে বিশেষ নিরাপত্তায় পুলিশ প্রহরায় আমরা তাদেরকে জেলগেটে পাঠাই। সেখান থেকে তারা নমুনা সংগ্রহ করে সেটার টেস্ট করা হয় এবং টেস্টের রেজাল্ট সিলগালা করে আমরা আবার তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে দিই।

তিনি আরও বলেন,  এমফিটামিন অনেকদিন পর্যন্ত রক্তে বা মূত্রে থাকে না, প্রস্রাবে সাধারণত ৫-৭ দিন থাকে, এরপরে আর পাওয়া যায় না। বিধায় যেহেতু এরা ৭ দিনের বেশি সময় ধরে আটক অবস্থায় আছে, তাই মাদক গ্রহণ করতে পারে নাই। বিধায় এই টেস্টটা নেগেটিভ আসছে। এটা আসাটাই স্বাভাবিক, কারণ ৭ দিনের বেশি হলে এটা প্রস্রাবের ভেতরে পাওয়া যায় না।

এদিকে, শিক্ষক পরিবারের হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আগামী ৩ দিনের মধ্যে যেকোনো ২ দিন ৩ ঘণ্টা করে ৬ ঘণ্টা জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার বিকেলে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম এ আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় তালাবদ্ধ একটি বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেসহ একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একই এলাকা থেকে প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেন। আসামিরা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। মামলাটি বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তদন্ত করছে।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এমএমবি

বিজ্ঞাপন