বিজ্ঞাপন

দুই বছর ধরে শিকলবন্দি বাবা, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে সন্তানদের

দুই বছর ধরে শিকলবন্দি বাবা, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে সন্তানদের

যে বাবা একসময় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতেন, আদর-স্নেহে আগলে রাখতেন, সেই বাবাই এখন দু’পায়ে লোহার শিকল নিয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। কখনও ঘুমের ঘোরে সন্তানদের গলা চেপে ধরেন, কখনও ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর কিংবা আগুন ধরিয়ে দেন। বাবার এমন আচরণে সন্তানরা যেমন কাছে যেতে ভয় পায়, তেমনি চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকায় দু’বছর ধরে শিকলেই কাটছে মুকুল মিয়ার জীবন। এদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় অনাহারে দিন কাটছে তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের।

এই পরিস্থিতি কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের চর বজরা গ্রামের কহিনুর বেগমের স্বামী মুকুল মিয়ার। এই অসুস্থ স্বামীকে ঘরে রেখে তিনি দিনে কাজ করে যা পান তাই দিয়ে দুমুঠো খাবার তুলে দেন সন্তানদের মুখে। প্রায় সময় না খেয়ে থাকতে হয় এই পরিবারের সদস্যদের। অসহায় এই পরিবারের পক্ষে মুকুলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সন্তানদের মুখে আহার তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে চর বজরা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, মুকুল মিয়ার (৩৮) পরিবার প্রায় দশবার তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছে। এই পরিবারটি বর্তমানে চর বজরা টারীপাড়ায় ওয়াপদা বাঁধের নীচে আশ্রয় নিয়েছে। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া তাদের কোনো জমিজমা নেই। একমাত্র থাকার ঘরটির টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে। গরমে আর বৃষ্টিতে কষ্টে কাটছে তাদের দিন।

আগে দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন মুকুল মিয়া। গত দুই বছর পূর্বে হঠাৎ করেই তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ও চুলকানির পর খাবারের প্রতি অনীহা চলে আসে। এরপর গ্রাম্য চিকিৎসক দেখানোর পরও কোনো উন্নতি হয়নি। অর্থের অভাবে গ্রামের বাইরে কোনো ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয়নি। ক্রমান্বয়ে মুকুলের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। তিনি কাজকর্ম বন্ধ করে দেন। মানুষের সাথে হিংস্র আচরণ শুরু করে দেন। পরিবারের লোকজনকেও তিনি মারধর করতে থাকেন। অবস্থা আরও গুরুতর হওয়ায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মুকুল মিয়ার দু’পায়ে লোহার শিকল বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখন পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।

পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে ভাইকে দেখতে আসা মুকুলের বোন শামসুন্নাহার বলেন, আমার ভাই মুকুল মিয়া দুবছর ধরে বিছানা নিয়েছে। কর্ম করতে পারে না। ছেলেমেয়েরা খেতে পারে না, চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। বড় মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে। ঘরে খাবার নাই, মেয়ের বিয়ে দিবে কীভাবে!

মাঝে মধ্যেই ছেলেকে দেখতে এসে আক্রমণের শিকার হন মুকুলের মা আকলিমা। তিনি জানান, মুকুল হিংস্র হয়ে গেলে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলে। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, মা সবাইকে মারধর করে। গলা টিপে ধরে। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। অপরিচিত লোকের উপর আক্রমণ করে। সে আমার বুকের পাঁজর ও ঘাড় ভেঙে ফেলার অবস্থা করেছে। আগুনে আমার হাত পুড়ে গেছে।

মুকুলের স্ত্রী কহিনুর বেগম (৩৪) জানান, আগে আমার স্বামী সুস্থ ছিল। আমরা ভালো ছিলাম। ৫ জনের সংসার কোনোরকম চলতো। এখন সে অসুস্থ, তার চিকিৎসা করাতে পারছি না। তার অত্যাচারে পরিবারসহ গ্রামের মানুষ ভয়ে থাকে। ফলে দুবছর ধরে তার পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছে। আমার বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। বেতন ও গাইডবুক কিনে দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজকর্ম সবসময় না থাকায় ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না। এখন আমার খুব কষ্ট হয়েছে।

মুকুলের ছোট মেয়ে ৪র্থ শ্রেণির মীম জানায়, আমার বাবা আগে খুব ভালো ছিল। আমাদের খুব আদর করতো। এখন বাবার হাতে খেতে পারছি না। আমি জামা-কাপড় ঠিকমতো পাচ্ছি না। পড়ালেখা ঠিকমতো করতে পারছি না। আমার বাবা এখন বিছানায় পড়ে আছে। আমাদের ওপর খুব অত্যাচার করে। তবু আমার বাবাকে আমরা ফেলে দেই নাই।

মুকুলের চাচাতো ভাই ফুল মিয়া জানান, পরিবারটি এতো অভাবী যে, একমাত্র ঘরটিও ঠিক করার মতো সামর্থ্য নাই। বৃষ্টি হলে ভাঙা টিনের চাল গড়িয়ে ঘরের ভিতর পানি পড়ে। থাকা যায় না। এই অবস্থা দেখে পলিথিন কিনে টিনের চালে ঢেকে দিয়েছি। বর্তমানে তাদের অবস্থা খুব খারাপ। স্ত্রী কাজ করলে মুখে ভাত যায়, নাহলে উপবাস! তাদের সহযোগিতা ও চিকিৎসা দরকার। ব্যবস্থা না করলে এরা না খেয়ে মারা পড়বে। এছাড়াও মুকুলের ভালো চিকিৎসা দরকার। স্থানীয় গ্রাম্য কবিরাজি চিকিৎসা করে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখন হিংস্র হয়ে যাওয়ায় তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার এখন উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু এরা মুখে আহার জোগাতে পারে না। ডাক্তার দেখাবে কীভাবে!

উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান জানান, মুকুল নামে যে ব্যক্তির তথ্য আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম, আমরা ওই এলাকায় আমাদের ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে পাঠাবো, তার তদন্ত সাপেক্ষে আমরা দ্রুত সমাজসেবা নির্ধারিত যে সেবাগুলো আছে সেই সেবার আওতায় আনার চেষ্টা করব।

এ ব্যাপারে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম আরিফকে বারবার কল করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মমিনুল ইসলাম বাবু/এসএইচএ