ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। আগস্ট মাসেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেকর্ড ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালটিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ডেঙ্গু সংক্রান্ত নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ জন। তবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১০৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮১ জন পুরুষ, ১৯ জন নারী এবং ৯ জন শিশু। পুরুষ রোগীদের মধ্যে ৭৮ জন সাধারণ ওয়ার্ডে, দুজন আইসিইউতে এবং একজন কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নারী রোগীদের সবাই সাধারণ ওয়ার্ডে রয়েছেন। শিশুদের মধ্যে চারজন ছেলে ও পাঁচজন মেয়ে।
আগস্টেই ভর্তি প্রায় ৬৭ শতাংশ রোগী
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট সকাল ৭টা পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৪৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৯৮২ জন পুরুষ, ৪০৪ জন নারী এবং ৬৭ জন শিশু।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ২২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন, মার্চে ১৫ জন, এপ্রিলে ৯ জন, মে মাসে ২০ জন, জুনে ৫৭ জন, জুলাইয়ে ৩৬০ জন এবং আগস্টে ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
পরিসংখ্যান বলছে, বছরের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশই ভর্তি হয়েছেন শুধু আগস্ট মাসে। একইভাবে চলতি বছরের ডেঙ্গুজনিত মোট ১০ মৃত্যুর মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে আগস্ট মাসে।
জুন থেকে বাড়তে থাকে সংক্রমণ
হাসপাতালের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসে রোগী ভর্তি ছিলেন ৯ থেকে ২২ জনের মধ্যে।
জুন মাসে রোগী ভর্তি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ জনে। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয় ৩৬০ জন। এরপর আগস্টে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। এ মাসে ৯৬৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন, জুলাইয়ে দুজন এবং আগস্টে চারজন মারা গেছেন।
২৭ নম্বর ওয়ার্ড ডেঙ্গু ওয়ার্ড করার পরিকল্পনা
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই আলাদা চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।
তিনি বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য আইসোলেটেড ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থাপনা টিম কাজ করছে। চিকিৎসক, নার্সসহ আলাদা জনবল নিয়ে এই টিম গঠন করা হয়েছে।

ডা. মাইনউদ্দিন খান জানান, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. এমদাদ এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোকাল পারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সেলিম। তাদের তত্ত্বাবধানে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসা ও সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ১০৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার শয্যার হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য জায়গা ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সংকট হওয়ায় পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে।
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের পুরো অংশকেই আইসোলেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে জানিয়ে ডা. মাইনউদ্দিন খান বলেন, বর্তমানে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর কোনো সংকট নেই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ ও মশারির ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করলেই হবে না। রোগের বিস্তার ঠেকাতে বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
সাখাওয়াত সুমন/আরএআর
