বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও স্বজনদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে শজিমেক হাসপাতালের সপ্তম তলায় এ ঘটনা ঘটে।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া শহরের রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মানিক (৫৫) শ্বাসকষ্ট নিয়ে শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মঙ্গলবার রাতে তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে একটি ইনজেকশন দেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, অন্য রোগীর জন্য নির্ধারিত ইনজেকশন আব্দুল মানিককে দেওয়ার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে প্রথমে বাগবিতণ্ডা হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। খবর পেয়ে বগুড়া সদর থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী বলেন, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে খবর পাই, শজিমেক হাসপাতালে মানিক নামের এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও একপর্যায়ে মারামারি হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ফোর্স নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি।
তিনি বলেন, ঘটনায় রোগীর স্বজনদের অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওসি জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া চারজন রোগীর স্বজন অথবা স্বজনদের সঙ্গে আসা ব্যক্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে নাফিউল ইসলাম (২৬), প্রান্ত (২২), রাকিবুল হাসান রাকিব (১৮), মুন্না শেখ ওরফে এসএম সিহাব (১৮), বিপ্লব সরদার (২৬) ও তানভীর শেখ (২৬) রয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন স্থানীয় ছাত্রদলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবি সংঘর্ষের সময় কয়েকজন চিকিৎসককে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চিকিৎসকেরা। তাদের দাবি, এতে অন্তত ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন। কয়েকজনের হাতের হাড় ভেঙে গেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ঋতু মণ্ডল স্নিগ্ধ বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, প্রায় ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন। কয়েকজনের হাতের হাড় ভেঙে যাওয়ার কথাও জানা গেছে।
তিনি বলেন, একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবায় যুক্ত থাকেন। ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক কয়েক সপ্তাহ হাত ব্যবহার করতে না পারলে চিকিৎসাসেবায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
ডা. রিতুল বলেন, ঘটনার বিষয়ে তথ্য হালনাগাদের কাজ চলছে। আহত চিকিৎসকদের সংখ্যা ও তাদের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত পরে জানানো হবে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাচ্ছি।
অন্য দিকে ঘটনার পর ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সদের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিনিয়র ও মিড-লেভেলের চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মনজুর এ মুর্শেদ বলেন, চিকিৎসকদের সেবা দিতে হলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, হাসপাতালটি শুরুতে ৫০০ শয্যার ছিল এবং সে অনুযায়ী জনবলও ছিল। পরে ১ হাজার ২০০ এবং সর্বশেষ ১ হাজার ৮০০ শয্যার অনুমোদন দেওয়া হলেও সে অনুযায়ী জনবল বাড়ানো হয়নি। ফলে অবকাঠামো ও জনবলের সক্ষমতার তুলনায় রোগীর চাপ অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন হাসপাতালে অবস্থান করায় রোগী ও স্বজন মিলিয়ে ভেতরে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি থাকে। এতে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
ডা. মনজুর এ মুর্শেদ বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও ব্যাপক ও পরিকল্পিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কোনো ঘটনা ঘটার পর নয়, ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে চিকিৎসকেরা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে সেবা দিতে পারেন।
আরেক ইন্টার্ন চিকিৎসক আজরাফ ইসলাম অর্ক বলেন, ঘটনার সময় তিনি ডিউটিতে ছিলেন না। ডিউটি শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা করতে সপ্তম তলায় গেলে একটি মৃতদেহ ঘিরে কয়েকজনকে জটলা করতে দেখেন। তার ভাষ্য, একপর্যায়ে একজন মিড-লেভেল চিকিৎসককে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে তিনি ওই চিকিৎসকের পেছনে যান।
আজরাফ ইসলাম অর্ক বলেন, রোগীর স্বজনদের কয়েকজন ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেছে এমন অভিযোগ তুলে ওই চিকিৎসকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সিনিয়র চিকিৎসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, আমার ওই রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। শুধু সিনিয়র চিকিৎসককে রক্ষা করতে সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন কয়েকজন আমার ওপর চড়াও হন এবং আমাকে মারধর করেন।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. আজফারুল হাবিব (রোজ) বলেন, এ ঘটনায় চিকিৎসকেরা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। একই সঙ্গে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত।
তিনি বলেন, ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে যেসব দাবি ও উদ্বেগ জানানো হয়েছে, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আপাতত মিড-লেভেল ও সিনিয়র চিকিৎসকদের মাধ্যমে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
ওসি ইব্রাহিম আলী বলেন, বহিরাগত বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না এমন নানা কথা শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। প্রাথমিকভাবে যাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, তাঁরা রোগীর স্বজন বা স্বজনদের সঙ্গে আসা ব্যক্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি এড়াতে চিকিৎসকদের ধর্মঘট না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আব্দুল মোমিন/আরকে
