মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গত আগস্ট মাসে লোকালয় থেকে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে অজগর, লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, শঙ্খচিল, তক্ষক, শঙ্খিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এসব প্রাণী লোকালয় থেকে উদ্ধার হওয়ার মূল কারণ হলো প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার একইসাথে খাবার সংকট।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন সুত্রে জানা যায়, গত ১ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। প্রাণীগুলোর অনেকগুলো ছিল আহত, অসুস্থ কিংবা ক্লান্ত। চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর সুস্থ প্রাণীগুলো বন বিভাগের সহায়তায় নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়।
ফাউন্ডেশন সূত্রে আরও জানা যায়, ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে আরেকটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি বেত আঁচড়া। ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধার করা হয়।
এরপর ১২ আগস্ট শাহীবাগ এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় একটি শঙ্খচিল। পরদিন ৫ নম্বর পুল এলাকা থেকে একটি অজগর এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ১৫ আগস্ট রূপশপুর থেকে একটি তক্ষক, নোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ, উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি লজ্জাবতী বানর এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল প্রজাতির সাপ উদ্ধার করা হয়।
১৯ আগস্ট মাঝেরগাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় উদ্ধার করা হয় একটি উল্টোলেজি বানর।
এছাড়াও ২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে উদ্ধার হয় আরও একটি শঙ্খিনী সাপ। পরদিন ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান ইউনিয়নের কুঞ্জবন এলাকা থেকে বিরল সাইবোল্ডস ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়। এরপর ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তি কোয়ার্টার, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে আরও তিনটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ বলেন, বন্যপ্রাণী দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে অনেক সময় মানুষ সেটিকে হত্যা করেন। অথচ প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। লোকালয়ে চলে আসা প্রাণীকে হত্যা না করে দ্রুত উদ্ধারকারী দল বা বন বিভাগকে খবর দেওয়া উচিত।
ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল বলেন, তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং হাইল হাওর থেকে এসব প্রাণী উদ্ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীগুলো আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ থাকে। তাদের সযত্নে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহায়তায় আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল একসময় ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু বনভূমি উজাড় হওয়া, মানুষের অনুপ্রবেশ, বসতি, রিসোর্ট ও কৃষিজমি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র ও খাদ্যের উৎস। ফলে খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে লোকালয়ের দিকে আসছে বন্যপ্রাণী।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণেই বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। বন ও পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে একদিন এসব প্রাণী পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মাহিদুল ইসলাম/এসএমডব্লিউ
