বিদ্যালয়ের ফটক পেরিয়ে ঘোড়ার গাড়িটি যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ছিল বিদায়ের আবেগ। কেউ ফুল ছুড়ে দিচ্ছিলেন, কেউ হাত নেড়ে জানাচ্ছিলেন শুভকামনা। ১৭ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আগলে রাখা প্রধান শিক্ষক নুর হায়দার রায়হান সেই গাড়িতে বসে ছিলেন।
অবসরের দিনে প্রিয় শিক্ষককে এভাবেই ব্যতিক্রমী আয়োজনে বাড়ি পৌঁছে দিলেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ৩৭ নম্বর জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটেছে এই ব্যতিক্রমী বিদায়ের ঘটনা।
দীর্ঘ ১৭ বছরের কর্মজীবন শেষে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর অবসরে যাচ্ছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর হায়দার রায়হান। তার বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। পরে ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে বিদ্যালয় থেকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। ব্যতিক্রমী এ আয়োজনকে অনেকেই ‘রাজকীয় বিদায়’ হিসেবে অভিহিত করেন।
নুর হায়দার রায়হান ২০০৯ সালে জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্ক ও শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ তাকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর কাছে একজন প্রিয় মানুষে পরিণত করে।

অবসর উপলক্ষ্যে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফুল দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা স্মারক ও আলোকবর্তিকা
অনুষ্ঠানে অতিথি, সহকর্মী এবং বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরে বক্তব্য দেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহসান উদ্দিন নাছিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফ. খ. ম. সাজ্জাদুল মানিক।
বিশেষ অতিথি ছিলেন, ময়মনসিংহ জেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, বাজিতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার আমিরুজ্জামান আরিফ এবং উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্যামল গোস্বামী ও সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মেরিনা ইয়াসমিন, শিক্ষার্থী আদিয়া রহমান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী আমিরুজ্জামান শরীফ ও কামরুল ইসলাম।
বক্তারা বলেন, একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নুর হায়দার রায়হান দীর্ঘদিন সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করেছেন। তার অবদান বিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩৭ নম্বর জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৮৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর নুর হায়দার রায়হান এই বিদ্যালয়েই তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন।
বিদায় সংবর্ধনার শেষ পর্বে আসে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত। ফুলে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় প্রিয় প্রধান শিক্ষককে। বিদ্যালয়ের ফটক থেকে বাড়ির পথে গাড়িটি এগিয়ে যাওয়ার সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী ফুল দিয়ে তাকে বিদায় জানান।
১৭ বছর ধরে যে বিদ্যালয়ের আঙিনায় কেটেছে তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়, সেই বিদ্যালয় থেকেই এমন ভালোবাসা আর সম্মানে বিদায় নিলেন নুর হায়দার রায়হান।
ঘোড়ার গাড়িতে তার এই বিদায় শুধু ব্যতিক্রমী আয়োজন নয়, প্রিয় শিক্ষককে ঘিরে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসারও এক অনন্য প্রকাশ হয়ে থাকল।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/এসএইচএ
