বিজ্ঞাপন

সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক

‘আমি যা বলি তাই আইন, ব্যাংক আমার কথায় চলে’

‘আমি যা বলি তাই আইন, ব্যাংক আমার কথায় চলে’

‘আমি সোনালী ব্যাংকের এজিএম ম্যানেজার, আমি চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। এই উপজেলার ইউএনও আমার দুই গ্রেড নিচে ষষ্ঠ গ্রেডে চাকরি করেন। আমি এই উপজেলার বড় কর্মকর্তা। আমি যা বলি তাই আইন, ব্যাংক আমার কথায় চলে।’

 রংপুরের পীরগাছা সোনালী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে সেবা প্রত্যাশী ও ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এমন দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

শাখা ব্যবস্থাপকের দুর্ব্যবহার, গ্রাহক হয়রানি ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শাখার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আলোচিত প্রফেসর রফিকুল হাসান। এ সময় তিনি অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত, জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

এ কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও শাখাটির সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ করেন।

গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপকের আচরণে সাধারণ সেবা প্রত্যাশীরা ব্যাংকমুখী হতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। মতিয়ার রহমান ও আব্দুল কুদ্দুছসহ একাধিক গ্রাহক বলেন, ম্যানেজারের দাম্ভিকতাপূর্ণ কথাবর্তা ও আচরণে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

মাসুদ রানা নামে এক গ্রাহক অভিযোগ করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও পীরগাছা শাখায় নির্ধারিত সময়ের আগেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আব্দুস ছালাম নামে আরেক গ্রাহক বলেন, ব্যাংকের স্বাভাবিক সেবা পেতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে সেবার বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার অভিযোগ, দুপুরের বিরতির সময় একই সঙ্গে দুই ডেস্কের লোকজন চলে যাওয়ায় গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। কিছু কর্মী দ্রুত কাজ করতে না পারায় অন্য কর্মীর সহযোগিতা নেন, যার কারণে দুই কর্মীর সময় অপচয় হয় এবং গ্রাহকদের সেবা পেতে আরও দেরি হয়।

হাফিজুর নামে এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওরা গ্রাহকদের মানুষ মনে করে না। হাবিব উল্লাহ নামে আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, হিসাব খোলার পরপরই চেকবই দেওয়া হয় না। তার অভিযোগ, চেকবই পাওয়ার ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।

কফিল নামে এক গ্রাহক বলেন, ব্যাংকের সেবাকর্মীদের আচরণ অত্যন্ত খারাপ। সাধারণ গ্রাহকদের সঙ্গে তাদের আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ।

শাখাটিতে চেকবই প্রদান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। মারুফ নামে এক গ্রাহকের অভিযোগ, নতুন গ্রাহকরা চেক নিতে গেলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। ম্যানেজার তাদের ডেকে নানা রকম দাম্ভিকতা দেখান। তাকে ম্যানেজার বলেন, ‘কত টাকার মালিক আপনি, চেক নিতে এসেছেন। আগে টাকা জমান, অ্যাকাউন্টে টাকা রাখেন, তারপর আসেন। তার অভিযোগ, অ্যাকাউন্টে এক লাখ টাকা না থাকলে চেকবই দেওয়া হয় না বলে তাকে জানানো হয়েছে।

মুরাদ নামে একজন বলেন, অবশেষে একজন অবস্থান কর্মসূচিতে বসছেন। ৩টায় ব্যাংক বন্ধ করে। এক ঘণ্টায় চা ফুকায়। রুবেল মিয়া নামে আরেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, তার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত লেনদেন থাকলেও এক লাখ টাকা অ্যাকাউন্টে না থাকলে সলভেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। এ কারণে প্রয়োজনীয় কাজেও তিনি সমস্যায় পড়েছেন বলে জানান।

কায়ছার আলী নামে এক গ্রাহক বলেন, সোনালী ব্যাংকের লোকেরা তো মনে করে আমরাই ওদের চাকরি করি। ওরা ভুলেই গেছে যে আমাদের টাকা দিয়েই ওদের মাসিক বেতন হয়।

শুধু গ্রাহক হয়রানিই নয়, শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষে সাধারণ গ্রাহকদের প্রবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। একাধিক গ্রাহকের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা বা সমস্যা নিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও সাধারণ গ্রাহকদের সহজে তার কক্ষে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হয় না। অথচ ম্যানেজারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি সারাদিন তার কক্ষে বসে থাকেন এবং সেখানে আড্ডা দেন বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, শাখায় ম্যানেজারের একটি ঘনিষ্ঠ মহল তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ওই মহলের সদস্যরা ব্যাংকের বিভিন্ন কাজে মধ্যস্থতা করেন এবং ম্যানেজারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের তুলনায় তারা বাড়তি সুবিধা পান।

ঋণ বিতরণ নিয়েও একাধিক গ্রাহক গুরুতর অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সাধারণ গ্রাহক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যোগ্যতা নিয়ে ঋণের জন্য ম্যানেজারের কাছে গেলে অনেক সময় সরাসরি ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ম্যানেজারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কথিত দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক গ্রাহকের দাবি, ম্যানেজার নিজে ঋণ দিতে না করে দিলেও কথিত দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকই ঋণ মিলে যায়। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহকরা ঋণ না পেলেও ঘনিষ্ঠ মহলের মাধ্যমে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

তাদের আরও অভিযোগ, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালার পাশাপাশি ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সুপারিশকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ঋণ নথি, আবেদন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ম্যানেজারের কথিত ক্ষমতার দম্ভের সঙ্গে শাখার বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তার ব্যক্তিগত প্রভাব স্পষ্ট। গ্রাহকদের সঙ্গে আচরণ থেকে শুরু করে ঋণ, চেকবই ও সলভেন্সি সার্টিফিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা পেতে সাধারণ মানুষকে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

এদিকে অবস্থান কর্মসূচির বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফেসবুকভিত্তিক ‘হামার পীরগাছা’ গ্রুপে পোস্ট করা হলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। পোস্টের নিচে অসংখ্য নেটিজেন সোনালী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় নিজেদের সেবার অভিজ্ঞতা এবং পীরগাছা শাখা নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। ম্যানেজারের দুর্ব্যবহারসহ নানা ধরনের হয়রানির বিষয়েও অনেকে মন্তব্য করেন।

অভিযোগকারীরা বলছেন, একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখায় গ্রাহকসেবা নিয়ে এত অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক। তারা ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে শাখা ব্যবস্থাপক মনিরুজ্জামান বলেন, আমি দূরে আছি। রোববার শাখায় আসেন একসঙ্গে চা খাবো।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ