দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও অব্যবস্থাপনায় বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে পিরোজপুরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। টার্মিনালের ভেতরের সড়কজুড়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায় পুরো এলাকা। এতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিক।
২০০৬ সালে নির্মাণের পর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনালে আধুনিকতার তেমন কোনো ছোঁয়া লাগেনি। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ভাঙাচোরা সড়ক, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নানা অব্যবস্থাপনায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে কোনো কোনো গর্ত ছোট জলাশয়ের মতো হয়ে আছে। কাদা-পানি মাড়িয়েই বাসে ওঠানামা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী, শিশু, বয়স্ক ও শিক্ষার্থীরা। কাদা-পানিতে কাপড় ও জুতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বড় গর্তে যানবাহনের চাকা আটকে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে প্রতিদিন টার্মিনাল ব্যবহার করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের।
পিরোজপুর থেকে নিয়মিত বরিশালে যাতায়াতকারী অনার্স শিক্ষার্থী শাকিব খান বলেন, টার্মিনালের অবস্থা খুবই খারাপ। ভেতরে ঢুকে বাসে উঠতে গেলে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই প্রবেশের কোনো উপায় থাকে না। ওয়াশরুম অনেক দূরে, সেখানে যেতেও কাদা ভেঙে যেতে হয়। টয়লেটের অবস্থাও করুণ। রিকশা নিয়ে ঢুকতে গিয়ে গর্তে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
যাত্রী রহিমা আক্তার বলেন, দূরপাল্লার বাসে যাতায়াতের সময় মালামাল নিয়ে টার্মিনালে চলাচল করতে অনেক সমস্যা হয়। টার্মিনালের ভাঙাচোরা ও কাদাযুক্ত অবস্থার কারণে রিকশাচালকরাও অনেক সময় ভেতরে যেতে চান না।

শুধু যাত্রী নয়, প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়ছেন বাস, মিনিবাস, অটোরিকশা, রিকশা ও মোটরসাইকেল চালকরাও। গর্তে যানবাহনের চাকা আটকে যাওয়া, কাদা-পানিতে পড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।
বাসচালক পান্না বলেন, টার্মিনালে ঢোকা ও বের হওয়ার সময় ভোগান্তির শেষ নেই। ভেতরের রাস্তা ভাঙাচোরা, বড় বড় গর্ত হয়েছে। এর মধ্যে গাড়ি চালানোর কারণে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায়ই মেরামত করতে হয়।
পরিবহন শ্রমিক ইব্রাহিম বলেন, যাত্রী ওঠানামার কোনো ভালো পরিবেশ নেই। কাদায় ছাত্র-ছাত্রী, শিশু, নারী-পুরুষ সবাইকে ভোগান্তি পোহাতে হয়। আমাদের দাবি, টার্মিনালটি সংস্কার করে পরিবহন সংশ্লিষ্ট সবার জন্য উপযোগী করা হোক।
মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে শহরের বাইপাস সড়কের পাশে মাছিমপুর এলাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উদ্যোগে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের সময় যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা অপ্রতুল হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে প্রায় ১৪টি রুটে ৬ শতাধিক বাস ও মিনিবাস এই টার্মিনাল ব্যবহার করছে। এসব যানবাহনে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। মালিক সমিতির দাবি, টার্মিনালের ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি বাস চলাচল করায় অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
বাস রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় টার্মিনালের ভেতরের পাশাপাশি বাইপাস সড়কের দুই পাশেও সারি সারি বাস দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। এতে সড়ক সংকুচিত হয়ে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের বসার জন্য নির্মিত ভবনটির অবস্থাও নাজুক। ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের সংস্কার হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
পিরোজপুর জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, টার্মিনালটি নির্মাণ করেছে এলজিইডি। আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু পৌরসভা তেমন কোনো কাজ করেনি। এ কারণেই টার্মিনালের এই করুণ দশা। টয়লেট দূরে এবং ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। দুই-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো এলাকা পুনর্নির্মাণ করতে হবে। আশা করি পৌর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেবে।

জানা গেছে, টার্মিনালে চলাচলকারী পরিবহন থেকে পৌরসভা টোল আদায় করে। প্রতিটি পরিবহন বাস থেকে ৫০ টাকা এবং লোকাল বাস থেকে ৩৫ টাকা করে পৌর টোল নেওয়া হয়। তবে এই আয় দিয়ে টার্মিনালের বড় ধরনের উন্নয়ন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পিরোজপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ধ্রুব লাল দত্ত বণিক বলেন, প্রতিবছরই টার্মিনালে মেরামতের কাজ করা হয়। তবে এখানে বড় ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন। আগের জেলা প্রশাসক একটি প্রকল্প পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সেটি পাস হয়নি। আমরা প্ল্যাটফর্ম ও আরসিসি রাস্তা নির্মাণ করতে চাই। পৌরসভার নিজস্ব আয় দিয়ে এ কাজ করা সম্ভব নয়। সরকার উদ্যোগ নিলে এবং প্রকল্প পাওয়া গেলে টার্মিনালের উন্নয়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু খানাখন্দ মেরামত করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। টার্মিনালের অবকাঠামো আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আরসিসি রাস্তা ও প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ এবং পুরোনো ভবন সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ থেকে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মুক্তি দিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাদী মো. হিমেল/এমএমবি
