বিজ্ঞাপন

নৌকা বাইচ দেখতে মানুষের ঢল

নদী বাঁচানোর আহ্বানে ঘাঘটের বুকে মাঝি-মাল্লাদের ছন্দবদ্ধ উৎসব

নদী বাঁচানোর আহ্বানে ঘাঘটের বুকে মাঝি-মাল্লাদের ছন্দবদ্ধ উৎসব

নদীমাতৃক বাংলাদেশে শতবছরের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। কালের বিবর্তনে নদ-নদীর মতো হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকা এই গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ঘাঘট নদীর বুকে আয়োজন করা হয়েছে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। নদীর বুকে মাঝি-মাল্লাদের ছন্দবদ্ধ বৈঠার টানের সাথে ঢাক-ঢোল, করতাল আর বাঁশির তালে মুখরিত হয়ে ওঠেছিল ঘাঘটপাড়। 

গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও বিনোদনের এক অন্যতম উৎসব হিসেবে প্রতিবছরই ঘাঘট নদীর দুই তীরে হাজারো মানুষের ঢল নামায় এই আয়োজন। ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে সবাই ভিড় করেন নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দেখতে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যাদের নৌকা বাইচ দেখার সুযোগ হয়নি, তারা গাছের ডালে উঠে বসেন। নদীতীরবর্তী আশপাশের ঘর-বাড়ির টিনের চালা ও ভবনের ছাদও ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রংপুর মহানগরীর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের হোসেন নগরে স্থানীয় যুব সংঘের আয়োজেন দুই দিনব্যাপী এ প্রতিযোগিতার প্রথম দিন ছিল। মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন, বিএনপি নেতা সেলিম চৌধুরী, আব্দুস সালাম, আয়োজক ও সাবেক তামপাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান আলী মিঞা প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খাল-বিল, নদী-নালায় প্রাণ ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। তিস্তাসহ ছোট-বড় নদী খনন কার্যক্রম অচিরেই শুরু হবে। তখন বিভিন্ন নদীতে সারাবছর নৌকা বাইচের মত গ্রামীণ খেলার আয়োজন করা সম্ভব হবে। আমরা সকলকে নিয়ে রংপুরের নদ-নদী রক্ষায় কাজ করে যাব।

মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বয়াক শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন, নৌকা বাইচ আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আমরা আয়োজকদের পাশে রয়েছি। নৌকা বাইচ খেলার মাধ্যমে নদীর প্রতি মানুষের ভালবাসা, মমত্ব বাড়বে। এতে করে নদী রক্ষায় সকলে এগিয়ে আসবে।

এদিকে, উদ্বোধনের পর ঘাঘট নদীতে রঙ-বেরঙের নৌকার সমাহার আর ঢাকঢোলের তালে গ্রামবাংলার গান ও মাঝি-মাল্লার বৈঠার ছন্দে উৎসবের ঢেউয়ে মাতোয়ারা হয়ে উঠে শান্ত ঘাঘটের বুক। নদীর দুইপাড়ে প্রায় ২ কিলোমিটার ধরে কয়েক হাজার মানুষের সমাগম। শুধু নগরী নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে কয়েক হাজার মানুষ দেখতে আসেন এই নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। শেষ মুহূর্তে দলগুলোর গতি আর উত্তেজনায় দর্শকদের মাঝে অন্যরকম উন্মাদনা কাজ করে।

মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ থেকে বাইচ প্রতিযোগিতা দেখতে আসা মজিবর রহমান (৬৫) বলেন, ‘নৌকা বাইচ হামার গ্রামের ঐতিহ্য। এই খেলা ম্যালাদিন ধরি হইতেছে। অনেক ভাল লাগে। সেইজন্তে ম্যালা দূর থাকি এই ঘাঘট নদীত বাইচ দেকিবার আসছি। এই খেলাত ম্যালা আনন্দ।’

একই উপজেলার পায়রাবন্দ থেকে আসা জালাল ও শামীম বলেন, এখন নদ-নদী নেই, এজন্য আগের মতো নৌকা বাইচ তো আর তেমন দেখা যায় না। আমরা গ্রামের কয়েকজন মিলে বাইচ প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছি।

পায়রাবন্দ বাজার এলাকার আমেনা খাতুন বলেন, ‘নৌকা বাইচ যুগ যুগ ধরে চলি আসছে। কিন্তু নদীত পানি থাকে না। উঁচা হয়া গেইচে। নদী যদি খনন না হয়, তাইলে সামনোত আর নৌকা বাইচ করা যাবার ন্যায়। হোসেন নগরোত এত বড় ব্রিজ কিন্তু বাইচ হইতোছে সরু হয়া যাওয়া ছোট একনা নদীত।’

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়ন থেকে আসা মাঝি নুরুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় অংশ নেই। এবার প্রথমবারের মতো রংপুরে এ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা যেন হারিয়ে না যায় সেজন্য প্রতিবছর এমন আয়োজন করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

রংপুর নগরীর পায়রা চত্বর এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থী সাহান বিন আলা বলেন, নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা দেখার মজাই আলাদা। সবার হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে মাঝি-মাল্লাদের প্রাণবন্ত জয়ের প্রচেষ্টা আর উদ্যোম অনুপ্রেরণাময়। এটা ভীষণ আনন্দের, অনেক ভালো লেগেছে।

নদীমাতৃক বাংলার এই প্রাচীন সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় এবং বিনোদনের সুস্থ খোরাক জোগাতে প্রতিবছরই স্থানীয়ভাবে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

আয়োজকরা বলছেন, আগে নদীকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নদী না বাঁচলে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্য, পেশা, জীবন ও প্রকৃতি। দ্রুত তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, করতোয়া ও শ্যামাসুন্দরীসহ সব নদ-নদী ও খাল খনন, শাসন ও সঠিক পরিচর্যার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আয়োজক কমিটির সভাপতি আজিজুর রহমান আজিজ জানান, ২০২১ সাল থেকে প্রতি বছর ঘাঘটে নৌকা বাইচ হয়ে আসছে। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে হোসেননগর যুব সমাজ এ নৌকা বাইচের আয়োজন করেছে। 

এদিকে, গতকাল প্রথম দিনের প্রতিযোগিতায় রংপুরসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে আসা বিজলী তুফান, স্বাধীনতার বিজয়, আল মদিনা, মায়ের দোয়া, ঘোড়াদহএকতা, ময়ুরপঙ্গী, হাতিয়ার বাঘ ও শাহপরান নৌকা বাইচের দল অংশ নেয়। নৌকাগুলো নিয়ে কয়েকটি রাউন্ডে এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। 

আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত খেলা শেষে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। 

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ

বিজ্ঞাপন