বিজ্ঞাপন

মাগুরার প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ‘নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ গুইসাপ

মাগুরার প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ‘নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ গুইসাপ

কালচে বাদামি শরীরের ওপর হলুদ ফোঁটা ও চক্রাকার নকশা। আকারেও বেশ বড়। খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়, ঝোপঝাড় কিংবা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে একসময় প্রায়ই দেখা মিলত প্রাণীটির। স্থানীয়ভাবে ‘গুইসাপ’, ‘সোনা গুইসাপ’ বা ‘কালো গুইসাপ’ নামে পরিচিত এই সরীসৃপ এখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মাগুরার প্রকৃতি থেকে।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Varanus salvator। এটি জল ও স্থল দুই পরিবেশেই চলাফেরা করতে পারে। দক্ষ সাঁতারু হওয়ার পাশাপাশি গাছে ওঠার ক্ষেত্রেও বেশ পারদর্শী। তবে আবাসস্থল ধ্বংস, জলাশয় ভরাট, ঝোপঝাড় উজাড়, নির্বিচারে শিকার এবং মানুষের ভুল ধারণার কারণে প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।

মাগুরা সদর, শ্রীপুর, মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এখনও মাঝেমধ্যে গুইসাপের দেখা মেলে। বিশেষ করে মহম্মদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশের খাল ও খালের পাড়ে মাঝে মধ্যে বড় আকৃতির গুইসাপ দেখা যায়। সম্প্রতি এমনই একটি বড় গুইসাপের দেখা মিলেছে সেখানে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বড় আকৃতির গুইসাপকে ঘড়িয়াল মনে করেন। তবে এটি মূলত গুইসাপ বা সরীসৃপ।

বিষহীন এই প্রাণীটি সাধারণত মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকে। বিপদ অনুভব করলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যায়। মানুষের জন্য ক্ষতিকর না হলেও গুইসাপকে নিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা বসতবাড়ির আশপাশে প্রাণীটি দেখা গেলে অনেকে এটিকে বিষাক্ত বা বিপজ্জনক মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেক সময় পিটিয়ে মেরেও ফেলা হয়।

অথচ প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুইসাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইঁদুর, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, বিভিন্ন ছোট প্রাণী এবং পচা-গলিত মৃতদেহ খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে প্রাণীটি। এ কারণে গুইসাপকে প্রকৃতির ‘নীরব পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ও বলা হয়। মৃত প্রাণীর দেহ পড়ে থেকে পরিবেশ দূষিত হওয়ার ঝুঁকি কমাতেও এদের ভূমিকা রয়েছে।

মহম্মদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুব্রত সেন বিশ্বাস বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে গুইসাপের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পচা, গলিত ও মৃতপ্রাণী খেয়ে এরা প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও মাগুরার গ্রামীণ এলাকায় গুইসাপ তুলনামূলক বেশি দেখা যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বসবাসের জায়গা কমে গেছে। খাল-বিল ও পুকুর ভরাট, জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, বসতবাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ এবং ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে গুইসাপের নিরাপদ আশ্রয়স্থল সংকুচিত হচ্ছে।

মাগুরা সদর ও শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় জলাশয় ও কৃষিজমির আশপাশের ঝোপঝাড় কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রও সংকুচিত হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে মহম্মদপুর ও শালিখার বিভিন্ন এলাকাতেও। ফলে আগে যেসব এলাকায় নিয়মিত গুইসাপের দেখা মিলত, সেসব এলাকায় এখন খুব কমই প্রাণীটির দেখা পাওয়া যায়।

আবাসস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি অতীতে চামড়ার জন্যও গুইসাপ শিকার করা হতো। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে গুইসাপের চামড়ার চাহিদা থাকায় একসময় নির্বিচারে শিকার হয়েছে প্রাণীটি। বর্তমানে আইনগত সুরক্ষা থাকলেও অবৈধ শিকার ও পাচারের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

জেলা জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল্লাহ বলেন, সরীসৃপ  আমাদের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। এটি বিষহীন এবং সাধারণত মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং ইঁদুর, বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী ও মৃতজীব খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের ভুল ধারণার কারণে প্রাণীটি দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরীসৃপ দেখলেই ভয় না পেয়ে এটিকে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে খাল-বিল, জলাশয় ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

পরিবেশসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরীসৃপ রক্ষায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কোনো এলাকায় সরীসৃপ  দেখা গেলে সেটিকে হত্যা না করে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। লোকালয়ে আটকা পড়লে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

মাগুরার সদর, শ্রীপুর, মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলার খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় ও প্রাকৃতিক ঝোপঝাড় সংরক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ শুধু প্রাণীটিকে রক্ষা করলেই হবে না, তার আবাসস্থলও টিকিয়ে রাখতে হবে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন পরিবেশসংশ্লিষ্টরা।

প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই প্রাণীটি মানুষের শত্রু নয়, বরং পরিবেশের উপকারী অংশ। তাই আতঙ্কে নয়, সচেতনতার মাধ্যমেই সরীসৃপ রক্ষা করতে হবে। তা না হলে একসময় মাগুরার খাল-বিল, জলাশয় ও ঝোপঝাড় থেকে হারিয়ে যেতে পারে গ্রামবাংলার পরিচিত এই বড় সরীসৃপ।

তাছিন জামান/এসএইচএ