হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত এক চিকিৎসক নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারপরও স্যালাইন আর হাতে ক্যানুলা নিয়ে চালিয়ে গেলেন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসা। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যা নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত মধ্যরাতে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। অসুস্থ সেই চিকিৎসকের নাম ডা. ইরফান মাহমুদ। তিনি গত কয়েকমাস ধরে হাসপাতালটিতে কর্মরত রয়েছেন।
হাসপাতালের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার দুপুর থেকে ৯ ঘণ্টার জন্য নিজের প্রথম শিফটে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন ডা. ইরফান মাহমুদ। সময়সূচি অনুযায়ী রাত ৮টায় তার ডিউটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী শিফটের জন্য অর্থাৎ ‘নাইট’ করার জন্য চিকিৎসক ছিল না হাসপাতালে। ফলে জরুরি বিভাগের চেয়ার থেকে না উঠে চালিয়ে যেতে শুরু করেন দ্বিতীয় শিফটের ডিউটি।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে ১২টা। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের রুম থেকে জরুরি বিভাগে খবর আসে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ইরফান মাহমুদ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। জরুরি বিভাগ থেকে হাসপাতালে স্টাফরা ছুটে গিয়ে চিকিৎসককে ভর্তি করান হাসপাতালে। এরপর তাকে ইনজেকশন ও স্যালাইন পুশ করা হয়। কিছুক্ষণ পর অসুস্থ চিকিৎসক হাতে ক্যানুলা নিয়েই ফের তার চেয়ারে বসে জরুরি বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে রাত পৌনে ২টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জরুরি বিভাগে আরেকজন চিকিৎসককে তার স্থলাভিষিক্ত করলে বাসায় ফেরেন ডা. ইরফান মাহমুদ। বর্তমানে বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল জেলা শহরের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু হাসপাতালটি রয়েছে তীব্র চিকিৎসক ও নার্স সংকট। ৮৭ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৩ জন। এর মধ্যে প্রশাসনিক পদে রয়েছেন ৩ জন এবং ৯২টি নার্সের পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৬ জন। এছাড়া হাসপাতালে প্রতিদিনই চিকিৎসা নেন ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণেরও বেশি রোগী।
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় সাংবাদিক ইকরামুল আলম ও উৎপল দেবনাথ বলেন, মধ্যরাতে নিজ বাড়িতে আমাদের এক সহকর্মী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ফোন পেয়ে আমরা দুজন দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যাই এবং তাকে চিকিৎসার জন্য জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। এ সময় আমাদের অসুস্থ সহকর্মীকে চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি দেন ডা. ইরফান মাহমুদ। তাকে কেবিনে নেওয়ার জন্য আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা খবর পাই হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তারা আরও বলেন,পরবর্তীতে আমরা জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখি ডা. ইরফান মাহমুদের চেয়ারের পাশে একটি স্ট্যান্ডে স্যালাইন ঝুলছে এবং ডাক্তারের হাতে ক্যানুলা। এ অবস্থাতেও মধ্যরাতে তিনি রোগীদের সেবা দিয়ে গেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো.জোবায়ের ও তালহা বলেন, ডাক্তার নিজে অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। অথচ সেই মুহূর্তে যদি তিনি তার চেয়ার ছেড়ে চলে যেতেন তাহলে হাসপাতালটি মধ্যরাতে ডাক্তার শূন্য হয়ে পড়তো। কিন্তু তিনি মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে চলে যাননি। ডা. ইরফান মাহমুদ যেটি করেছেন এটি হল তার সত্যিকারের দায়িত্ববোধ, তার থেকে আমাদের শেখার আছে।
এ বিষয়ে ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, চিকিৎসক ও নার্স সংকট ভোলা সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার বার জানানো হলেও এর কোনো সমাধান হয়নি। তারপরও আমরা যারা হাসপাতালে কর্মরত রয়েছি তারা সকলেই নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে ভোলার মানুষের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। যেমন ডা. ইরফান মাহমুদের চিত্রটি।
খাইরুল ইসলাম/আরএআর
