দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানী বিভিন্ন এলাকায়। এই সংকটের বাইরে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও মেসে (ডাইনিং) গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় বিকল্প হিসেবে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। ফলে রান্না সময়মতো না হওয়ায় খেতে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা৷
সরেজমিনে দেখা গেছে, লাকড়িতে রান্নার অতিরিক্ত ব্যয়ে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। ক্যান্টিনের খাবারের মান কমেছে, ক্ষেত্রবিশেষে বেড়েছে খাবারের দাম। সময় মতো খাবার পাচ্ছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া আগের তুলনায় খাবারের আইটেম (পদ) কমে গেছে। কোনো কোনো হলে পাওয়া যাচ্ছে না নাস্তার আইটেমও (পদ)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ক্যান্টিন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনেক ক্যান্টিনে সঠিক সময়ে নিয়মিত রান্না করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। এতে ক্যান্টিনভেদে মাসে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনগুলোতে গ্যাসের খরচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করে থাকে। বর্তমানে গ্যাস না থাকায় লাকড়ির অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে খাবারের দাম বৃদ্ধির চিন্তা করছেন ক্যান্টিন মালিকরা।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত তাদের ওপরই চাপছে। লাকড়ি দিয়ে রান্নার কারণে খাবারের মানও আগের মতো নেই। সংকট দীর্ঘায়িত হলে খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। শিক্ষার্থীদের দাবি, জ্বালানি সংকটের পুরো চাপ তাদের ওপর না দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে জ্বালানি ব্যয়ের ভর্তুকি দেওয়া উচিত।
২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী ফাহিম আব্দুল্লাহ বলেন, গ্যাসের অপ্রতুলতায় ক্যান্টিনগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ ক্যান্টিন মালিকরা নিজেদের পকেট থেকে দেবেন না, শেষ পর্যন্ত খাবারের দাম বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরই এর চাপ পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ার খাবারের জন্য সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিজয় একাত্তর হল ক্যান্টিনের মালিক বলেছেন, তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় এক মাস ধরে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এতে একদিকে রান্নার খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে খাবারের মান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক হল ক্যান্টিন মালিক ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন, গ্যাসসংকট যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তাদের পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে। বর্তমানে লাকড়ি কিনতে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে খাবারের দাম সমন্বয় করার প্রয়োজন হতে পারে।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ক্যান্টিন মালিক বলেন, গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন দুই-তিন মণ লাকড়ি প্রয়োজন হচ্ছে। সব মিলিয়ে মাসে ৪৫ হাজার টাকার মতো বাড়তি খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি খরচের প্রভাব খাবারের মানে পড়ছে। মাসে অতিরিক্ত যে টাকা লাকড়ি কিনতে ব্যয় হচ্ছে, তা খাবারের মান উন্নয়নে ব্যয় করা গেলে খাবারের মান আরও ভালো করা সম্ভব হতো। লাকড়িতে রান্নার কারণে খাবার পরিবেশনেও দেরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনগুলোতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। আমরা প্রশাসনকে বলেছি, এই সংকটের সময়ে ক্যান্টিনগুলোকে ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, কোনো একটি মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবে। ভিসি স্যার ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করছেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যে এটি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে আমাদের ভিন্ন কোনো কর্মসূচিতে যেতে হতে পারে। এই সংকটময় পরিস্থিতি আমরা আর চলতে দিতে পারি না। গ্যাস না থাকায় লাকড়ি কিনতে হচ্ছে, খরচ বেড়ে যাচ্ছে, সময়মতো খাবার দেওয়া যাচ্ছে না। আবার বাড়তি খরচের কারণে খাবারের দামও বাড়ছে। সব মিলিয়ে একটা সংকটের চক্র তৈরি হচ্ছে। তবে আমি ভিসি স্যারের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখতে চাই।
গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজী আকরাম হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবহিত করেছি। ইতিপূর্বেও আমরা তা করেছি। তবে এটি জাতীয় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এই সমস্যার সমাধান করার মতো তেমন কিছু নেই। এর সমাধান জাতীয় পর্যায়েই করতে হবে।
প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সংকট আরও বাড়লে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কোনো হলে গ্যাস সংকটের কারণে রান্না বা খাবার পরিবেশনে সমস্যা হলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন হলের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছি, যাতে খাবার রান্নায় কোনো সংকট না থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রাখব। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এজেডআর/এএমকে
