বান্দরবানের রুমা বাজার থেকে বগালেক, কেওক্রাডং, পাসিং পাড়া হয়ে সুংসাং পাড়ায় যেতে পর্যটকদের গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। পাহাড়ি দুর্গম সড়ক, জ্বালানি ও গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি— এমন যুক্তিতে জিপ মালিক সমিতির নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে একদিকে রয়েছে মালিকদের ব্যাখ্যা, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ তুলছেন পর্যটকরা।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুমা উপজেলায় ঘুরতে গিয়ে বাড়তি ভাড়া ও ট্যুরিস্ট গাইডের পেছনে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ে অসন্তোষ ও ক্ষোভ জানিয়ে অনেক পর্যটক তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন।
রুমা বাজার থেকে বগালেকের দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। পাহাড়ি ভাঙা ও উঁচুনিচু সড়কের কারণে চাঁদের গাড়ি বা জিপে সেখানে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। রুমা বাজার থেকে বগালেক হয়ে কেওক্রাডংয়ের দূরত্ব প্রায় ৩০ থেকে ৩২ কিলোমিটার। আর কেওক্রাডং ও পাসিং পাড়া হয়ে সুংসাং পাড়ার দূরত্ব প্রায় ৩৯ থেকে ৪০ কিলোমিটার।
বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি উঁচুনিচু ও আঁকাবাঁকা সড়কে গাড়ির জ্বালানি দক্ষতা সমতল সড়কের তুলনায় কমে যায়। ফলে একই দূরত্বে জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়। পাহাড়ি রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ি বা জিপের মাইলেজ সাধারণত ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার প্রতি লিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
স্থানীয় গাড়ির চালকরা জানান রুমা বাজার থেকে সুংসাং পাড়া যাওয়া-আসা একটি গাড়ির ২৭ লিটার তেল খরচ হয়। আর রুমাতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১২৫ টাকা। টাকার অংকে হিসাব করলে তা হয় ৩ হাজার ৩৭৫ টাকা। অথচ গাড়ি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা।
রুমা জিপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক কর্মকার বলেন, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করে ভাড়ার তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে, গত সপ্তাহে প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পর আগের ভাড়া থেকে প্রতিটি স্পটে ৫০০ টাকা করে কমানো হয়েছে। রুমা বাজার থেকে কেওক্রাডং যাওয়া-আসার ভাড়া আগে ছিল ৭ হাজার টাকা। এখন তা কমিয়ে সাড়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। একইভাবে সুংসাং পাড়ার ভাড়া আগে ছিল ১০ হাজার ৫০০ টাকা, এখন ৫০০ টাকা কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর বগালেকের ভাড়া সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪ হাজার টাকা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো পর্যটক গাড়ি নিয়ে রাতে স্পটে অবস্থান করলে অতিরিক্ত ১ হাজার টাকা দিতে হয়। কারণ চালককে সেখানে রাত কাটাতে হলে পরদিন সকালে অন্য কোনো ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
তার দাবি, রুমায় ডিজেলের দাম বান্দরবান সদরের তুলনায় বেশি। পাশাপাশি পাহাড়ি উঁচুনিচু সড়কে গাড়ি অধিকাংশ সময় লো গিয়ারে চালাতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে। দুর্গম সড়কে চলাচলের কারণে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেশি হয়।
তবে জিপ মালিক সমিতির নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পর্যটকদের অনেকে। রুমা থেকে সুংসাং পাড়া ঘুরতে যাওয়া কয়েকজন পর্যটক বলেন, এখানকার বেশিরভাগ চালকই গাড়ির মালিক। ফলে তারা একদিকে গাড়ির মালিক হিসেবে লাভ করছেন, অন্যদিকে চালক হিসেবেও আয় করছেন। এ কারণে ভাড়ার পরিমাণ বেশি হচ্ছে। প্রশাসনের উচিত ভাড়ার বিষয়টি নজরদারির আওতায় এনে পর্যটকদের জন্য সহনীয় ও পর্যটনবান্ধব ব্যবস্থা চালু করা।
রুমা বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ময়ূর বলেন, জিপ মালিক সমিতির নির্ধারিত ভাড়া কিছুটা কমানো হলে পর্যটকদের জন্য ভালো হবে। একই সঙ্গে গাইডের পারিশ্রমিক নিয়েও পর্যটকদের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, একজন পর্যটক সকাল থেকে গাইড নিলে পরদিন সকাল ৮টা হয়ে গেলে ২ দিনের গাইডের পারিশ্রমিক দিতে হয়। এতে পর্যটকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। আবার দুইজন পর্যটক এলে অনেক সময় গাইডের জন্য আলাদা মোটরসাইকেল ভাড়া করতে হয়। তখন মোটরসাইকেলের ভাড়ার পাশাপাশি গাইডের পারিশ্রমিকও দিতে হয়। ফলে ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
তবে জিপ ভাড়ার তালিকা উপজেলা প্রশাসনকে অবগত করা হয়েছে— এমন বক্তব্য নাকচ করেছেন রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথি।
তিনি বলেন, রুমা জিপ মালিক সমিতি উপজেলার বিভিন্ন স্পটের গাড়ি ভাড়ার যে তালিকা দিয়েছে, তা প্রশাসনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেওয়া হয়নি। সমিতি তাদের আগের ভাড়ার তালিকাই সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্বাক্ষরে প্রকাশ করেছে।
ইউএনও জানান, অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পর্যটকদের সমস্যা হলে উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদারকি করে দেখবে।
স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, রুমার দুর্গম পাহাড়ি পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াতের খরচ স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক বেশি। তবে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের ব্যয়ের পাশাপাশি পর্যটকদের সামর্থ্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গাইড ও মোটরসাইকেল ভাড়ার ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা থাকলে পর্যটকদের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ কমবে।
আরএআর
