বিজ্ঞাপন

তদন্তে ১০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ, বিকাশ নম্বর দিলেন এসআই

তদন্তে ১০ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ, বিকাশ নম্বর দিলেন এসআই

শরীয়তপুরের জাজিরায় পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে এক নারীকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ উঠেছে থানার এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। টাকা চাওয়ার পর ভুক্তভোগীর এক আত্মীয়ের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই পুলিশ সদস্য নিজের বিকাশ নম্বরও দেন তিনি।

এরই মধ্যে সেই কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসআই। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের নাম রফিকুল ইসলাম। তিনি জাজিরা থানায় উপ-পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত।

ভুক্তভোগী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের মালেক শেখের মেয়ে ইতি আক্তারের সঙ্গে জাজিরা পৌরসভার সোনার দেউল এলাকার নূর মোহাম্মদ শেখের ছেলে সাত্তার শেখের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ করেন ইতি। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট রাতে পারিবারিক ঝগড়ার একপর্যায়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর গত ৪ সেপ্টেম্বর স্বামী সাত্তার শেখসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিরোধ, শারীরিক নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ইতি আক্তার। অভিযোগটি গ্রহণের পর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই রফিকুল ইসলামকে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য, তদন্তের বিষয়ে যোগাযোগের একপর্যায়ে এসআই রফিকুল ইসলাম তার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে ইতি আক্তারের এক নিকটাত্মীয় সৌদি প্রবাসী দুলাল মোড়লের সঙ্গে ওই পুলিশ কর্মকর্তার মুঠোফোনে কথা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কথোপকথনের ভিডিওতে টাকা পাঠানোর প্রসঙ্গ এবং একপর্যায়ে এসআই রফিকুল ইসলামকে নিজের বিকাশ নম্বর দিতে শোনা যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সৌদি প্রবাসী দুলাল মোড়লকে বলতে শোনা গেছে, ‘আপনে জাজিরা থানায় আছেন? ওই ব্যাপারটার তদন্তে কে যাবেন, আপনি?’

জবাবে এসআই রফিকুল ইসলাম: হ।

এসময় দুলাল মোড়ল বলেন, ‘আপনি যে খরচের কথা বলছিলেন, কত দিম? কত দেয়া লাগবো? অর (ইতি) কাছে তো টাকা নাই। টাকা হেনতে (এখান থেকে) দেয়া লাগবো আমার। কত দেয়া লাগবো?’

এসআই রফিকুল ইসলাম: ‘১০ এর মতো দিয়া দেন।’

দুলাল মোড়ল: ‘১০ হাজার?’ 

এসআই রফিকুল ইসলাম: ‘হ’।

দুলাল মোড়ল: ‘আপনার বিকাশ নম্বর কোনডা? নম্বরটা একটু দেন।’ এসময় এসআই রফিকুল ইসলামকে তার বিকাশ নম্বর বলতে শোনা গেছে ভিডিওতে।

ভুক্তভোগী ইতি আক্তার বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের জন্য নির্যাতন করত। কয়েকদিন আগে মারধরের পর আমি থানায় লিখিত অভিযোগ করি। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই রফিকুল স্যারকে। তিনি আমার কাছে টাকা চান। আমি বলি, আমার এক ভাই প্রবাসে থাকেন, তিনি টাকা দেবেন। পরে তার সঙ্গে কথা বলে পুলিশ সদস্যকে টাকা দেওয়ার জন্য বিকাশ নম্বর নেওয়া হয়। কিন্তু আমার ভাই টাকা না দেওয়ায় এখন আমাদের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ঘটনার তদন্তও ঠিকভাবে করা হচ্ছে না। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।

ইতির মা খাদিজা বেগম বলেন, পুলিশ টাকা চাইলে আমরা বলি, আমাদের কাছে টাকা নেই। আমার ভাতিজা দুলাল বিদেশে থাকে, সে টাকা দেবে। পরে দুলাল ওই পুলিশকে টাকা না দেওয়ায় আমার মেয়ের ঘটনার কোনো সমাধান হয়নি। আমরা থানায় গেলেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

তবে টাকা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসআই রফিকুল ইসলাম। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

এ বিষয়ে জাজিরা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ্ আহমেদের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দোহাই দিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শরীয়তপুর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জাকারিয়া রহমান।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী কেউ আমার কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। আমরা এটি খতিয়ে দেখছি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নয়ন দাস/এসএইচএ 

বিজ্ঞাপন