বিজ্ঞাপন

অপচিকিৎসার বিচার দাবি

মোবাইলের আলোতে ৩ ঘণ্টা ধরে সিজার, মৃত্যুশয্যায় প্রসূতি

মোবাইলের আলোতে ৩ ঘণ্টা ধরে সিজার, মৃত্যুশয্যায় প্রসূতি

বাগেরহাটের চিতলমারীতে মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে লাভলী ঘরামী নামে এক প্রসূতিকে তিন ঘণ্টাব্যাপী সিজারের অভিযোগ উঠেছে হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী প্রসূতির স্বজনদের দাবি- ভুল অস্ত্রোপচার ও অপচিকিৎসার ফলে লাভলী ঘরামী এখন মৃত্যুশয্যায়।

এ ঘটনায় ক্লিনিক মালিক ও চিকিৎসকের বিচারের দাবিতে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চিতলমারী উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন করেছেন রোগীর স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

তবে এর আগে বেলা ১১টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে মানববন্ধন করার জন্য জড়ো হন স্থানীয়রা। কিন্তু তখন ক্লিনিক মালিকের লোকজন মানববন্ধনে বাধা দেয় এবং গণমাধ্যম কর্মীদের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।

লাভলী ঘরামীর স্বামী শমরেস ঘরামী জানান, তার সন্তানসম্ভাবা স্ত্রী লাভলী ঘরামী অসুস্থ হলে স্থানীয় হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টি সেন্টারে নিয়ে যান। ওই ক্লিনিকের উপসহকারী মেডিকেল অফিসার অমিত মন্ডল লাভলী ঘরামীকে তাদের ক্লিনিকে ৫০ হাজার টাকার চুক্তিতে সিজারের পরামর্শ দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, অভিজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে অস্ত্রোপচার করাবেন। কিন্তু ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় অমিত, রুপম ও ক্লিনিকের রফিক অস্ত্রোপচার করার জন্য লাভলী ঘরামীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। এ সময় তিনি ক্লিনিকে অন্য কাউকে দেখতে পাননি। অস্ত্রোপচারকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু না হওয়ায় তারা মোবাইলের আলো জ্বেলে তার স্ত্রীর অপারেশন করেন। তার স্ত্রীর অপারেশন শেষে হতে প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। পরববর্তীতে তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। নবজাতক অসুস্থ হলে তাকে গোপালগঞ্জ আইসিইউতে পাঠানো হয়। ৭ দিন পর নবজাতকটি মারা যায়।

তিনি আরও জানান, অস্ত্রোপচারের পর থেকে তার স্ত্রীর অনবরত প্রসাব ঝরতে থাকে। ২ আগস্ট তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ীতে আসেন। ৩ আগষ্ট স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পুনরায় হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভর্তি করেন। পরদিন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ লাভলী ঘরামীকে খুলনার একটি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। সেখান থেকে তারা খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক ডা. সজল কান্তি বিশ্বাসকে দেখান ও খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিষেশায়িত হাসপাতালের চিকিৎসক এস এম হুমায়ুন কবীর অপুর পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। পরীক্ষায় অপচিকিৎসার কারণে লাভলী ঘরামীর জারায়ু কাটা হয়েছে এবং মূত্রথলি ছিন্দ্র হয়েছে বলে ধরা পড়েছে।

শমরেস ঘরামী জানান, দীর্ঘ ৩৮ দিন চিকিৎসার পর গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) শমরেস ঘরামী তার স্ত্রীকে নিয়ে চরবানিয়ারী রানাপাড়া গ্রামে ফিরেছেন। তার স্ত্রী বর্তমানে মৃত্যুশয্যায়। তাদের প্রাঙ্গন (১২) ও পৃথা ঘরামী (৬) নামে দুটি সন্তান রয়েছে। শমরেস ঘরামী এই অপচিকিৎসাকারীদের বিচার দাবি করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ওয়াবায়দুল্লাহ বলেন, একজন উপসহকারী মেডিকেল অফিসার অর্থ্যাৎ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল-ম্যাটস থেকে পাশ করা একজন ব্যক্তি কোনোভাবে অপারেশন করতে পারে না। এটা অবশ্যই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের খেয়াল রাখা উচিত ছিল। আর অপারেশনের সময় ক্লিনিকের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপমও ছিল। ক্লিনিকের মালিক ও যারা অপারেশনের সময় ছিল তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

মানববন্ধনে উপস্থিত মো. সালমান শেখ বলেন, মানুষ টাকা দিয়ে সুস্থ হওয়ার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে যায়। কিন্তু ক্লিনিক মালিক ও চিকিৎসকদের খামখেয়ালীপনা এবং ভুল চিকিৎসার ফলে মানুষ শারীরিক এবং আর্খিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষের জীবন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলে তাদের আইনের আওতার আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টি সেন্টারের উপসহকারী মেডিকেল অফিসার অমিত মন্ডলের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ওই রোগীর কোনো অপারেশন করিনি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ওই সিজারের অপারেশন করেছেন ডা. নাসির উদ্দীন।

হাবিবা ক্লিনিক অ্যান্ড বারিশ ডায়াগনস্টি সেন্টারের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম বলেন, আমার ক্লিনিকে সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী চলছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই।

চিকিৎসক নাসির উদ্দীন বলেন, আমি গাড়ির ভিতরে আছি। গাড়ি থেকে নেমে আমি আপনাকে পরে ফোন দেব। তবে রোগীর সুস্থতার জন্য আমি এবং ক্লিনিক মালিক সহযোগিতা করবো। আপনি অস্ত্রোপচার করেছেন কি না— এমন প্রশ্নে তিনি ফোন কেটে দেন।

এদিকে এ ঘটনায় সঠিক বিচার ও ক্ষতিপূরণ পেতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, অপচিকিৎসা সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর আগেও তাদের বিরুদ্ধে অন্য একটি ঘটনার অভিযোগ পেয়ে সিভিল সার্জন পরিদর্শন করেছেন এবং এই ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। 

শেখ শামীম হাসান/আরএআর