বিজ্ঞাপন

৩৫ বছরের জরাজীর্ণ সেতু

‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে’

‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে, কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে’

‘আমাদের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা কেউ শুনে না। সবাই শুধু ভোটের সময় এসে দেখে যায়। গত ১৫-১৬ বছরে বহুবার ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটির সংস্কারের জন্য এমপি, চেয়ারম্যান ও মেম্বারকে হাত জোর করা হয়েছে। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে— এটা করবে ওটা করবে। কিন্তু কিছুই করা হয়নি। এখন মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটলেও ছোটবড় সবাই আতঙ্ক নিয়েই সেতু দিয়ে চলাচল করছে। কবে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে, কেউ জানে না।’

ঝুঁকিপূর্ণ সেতু হয়ে গ্রামের মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের কষ্ট তুলে ধরে কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক কৃষক জহুরুল ইসলাম। তিনি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের শাইলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা।

শাইলবাড়িসহ পার্শ্ববর্তী ভীমপুর ও ডাংগাপাড়া গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে সরমংলা নদী। এ নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫ বছরের পুরোনো একটি জরাজীর্ণ সেতু। নদী পারাপারে স্থানীয় মানুষের একমাত্র ভরসা ৩৫ বছরের পুরোনো একটি সেতু। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুই এখন আশপাশের ১০ গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৩৫ বছর আগে নির্মিত পুরোনো সেতুটির রেলিং ভেঙে গেছে, কোথাও আবার পুরোপুরি উধাও। সাড়ে তিন ফুট চওড়া এ সেতুর দুই পাশের নিরাপত্তা রেলিংয়ের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। পিলারের পলেস্তারা খসে বেরিয়ে পড়েছে রড। সেতুর বুক-পিটে ছোট ছোট গর্তের ক্ষতচিহ্ন। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এখন নড়বড়ে দেহে দাঁড়িয়ে আছে ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুটি। মোটরসাইকেল কিংবা বাইসাইকেল ছাড়া যেতে পারে না কোনো যানবাহন।

স্থানীয়রা জানান, এই সেতু দিয়ে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের স্কুল-কলেজ ও মাদরাসাপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ছাড়াও কৃষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশাজীবীসহ ২৫ হাজার মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে। তবে সরু সেতু হওয়ায় গ্রামের কেউ যদি অসুস্থ হয়ে যায় অ্যাম্বুলেন্স বা মাইক্রোবাস যেতে পারে না। ঝুঁকিপূর্ণ এ সেতুর ওপর দিয়ে অটোরিকশা, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

শাইলবাড়ী এলাকার বাসিন্দা স্থানীয় মাদরাসার শিক্ষক এশরামুল হক বলেন, ‘ব্রিজটা দিয়ে চলাচল করা যায় না। রিকসা-ভ্যান, মাইক্রো, অটো চলে না। ব্রিজ কেন বানাইছে? একদম চিকন।’

ডাংগাপাড়া গ্রামের লোকমান হোসেন বলেন, ‘ব্রিজোত উঠলে নড়ে কখন যে ভাঙ্গি পড়ি যায় আল্লায় জানে। ব্রিজের রেলিংগুলা ভাঙ্গি গেইছে। খুঁটিগুলাতো ফাটি গেইছে।’

স্থানীয় সংবাদকর্মী দিপক রায় বলেন, সেতুটির বেহাল দশার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও মাদরাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। আশপাশের ১০ গ্রামের কৃষকরা ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সহজে হাট-বাজারে নিতে পারছেন না। ভারী যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, ঝুঁকির কারণে ভ্যান ও অটোরিকশাও সেতুটি পার হতে চায় না। ফলে কৃষকদের বিকল্প দীর্ঘপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সময়ের পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন খরচ।

প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করলেও দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির কোনো কার্যকর সংস্কার হয়নি। ওই সেতুর দৈর্ঘ্য ৯০ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ৩ ফুট। সেতু সংস্কার বা কীভাবে নতুন সেতু নির্মাণ করা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে বলেও জানা গেছে।

এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী নাফিউর রহমান বলেন, সেতুটির জরাজীর্ণ অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুনর্নির্মাণের জন্য জেলা পর্যায়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বাজেট ও নতুন প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে। তবে কবে নাগাদ এটি হতে পারে, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর