বিজ্ঞাপন

লাল শাপলার রাজ্যে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা

লাল শাপলার রাজ্যে ছুটছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে নেমে আছে নীরবতা। বৃষ্টিভেজা বাতাসে মিশে আছে বর্ষার স্নিগ্ধতা। গ্রামের মরা নদীর শান্ত পানিতে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে আছে অগণিত লাল শাপলা। সকালের নরম আলোয় লাল পাপড়ি আর সবুজ পাতার মেলবন্ধনে মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এঁকেছে লাল-সবুজের এক জলরঙের ছবি।

ভোর যত বাড়ে, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শাপলার সৌন্দর্য। পানির ওপর দুলতে থাকা ফুলগুলো যেন হাসছে। কোথাও পাশাপাশি ফুটে আছে একগুচ্ছ শাপলা, কোথাও আবার সবুজ পাতার বিস্তীর্ণ চাদরের মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে লাল ফুল। দূর থেকে তাকালে পুরো জলাশয়টিকেই মনে হয় বাংলাদেশের পতাকার মতো।

এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়ির পুকুরঘাট-সংলগ্ন মরা নদীর বিভিন্ন অংশে।

বর্ষার পানিতে এবার সেখানে ফুটেছে অসংখ্য লাল শাপলা। ভোরে একসঙ্গে হাজারো শাপলা ফুটে ওঠায় জায়গাটি যেন পরিণত হয়েছে লাল শাপলার এক টুকরো রাজ্যে।

শুধু ফুল নয়, এই সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে গ্রামের চিরচেনা প্রকৃতি। শান্ত জল, ভেজা মাটি, হিমেল বাতাস আর দূরের সবুজ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। শাপলার পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু সকালের সূর্যের আলোয় চিকচিক করে ওঠে মুক্তোর মতো। সেই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন বিভিন্ন এলাকার প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

তবে এই সৌন্দর্য দেখারও রয়েছে সময়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন ভোরে শাপলাগুলো পূর্ণ বিকশিত হয়। সূর্যের তাপ বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে পাপড়ি গুটিয়ে আসে। তাই সূর্য ওঠার আগের সময়টিই শাপলার সৌন্দর্য উপভোগের সবচেয়ে ভালো সময়।

পাকুন্দিয়া থেকে শাপলা দেখতে আসা জাহিদ মিয়া বলেন, এখানের লাল শাপলার কথা জানতে পেরে দেখতে এসেছি। সকালে এসেছি, দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ভোরে আসতে পারলে আরও ভালো লাগতো। তবে এখানে ফুল না তোলার জন্য সাইনবোর্ড দেওয়া এবং মানুষকে সচেতন করা দরকার।

করিমগঞ্জ থেকে আসা আশিক রহমান বলেন, সকালে লাল শাপলা দেখে মনটা জুড়িয়ে গেল। আমাদের জেলার মধ্যে এই প্রথম এতগুলো লাল শাপলা দেখলাম। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন উদ্যোগ নিলে জায়গাটি পর্যটনের নতুন আকর্ষণ হতে পারে।

মসূয়া গ্রাম এমনিতেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত। সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়িকে ঘিরে রয়েছে ঐতিহাসিক আবহ। বাড়িতে রয়েছে একটি দ্বিতল অতিথিশালা। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সেখানে আগত পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। উপজেলা সদর থেকে বেতাল বাজার হয়ে রায়বাড়ির দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। পৈতৃক বাড়ি ঘুরে দেখার পাশাপাশি বর্ষায় লাল শাপলার সৌন্দর্য এবং কাছাকাছি নিকলী হাওরের অথৈ জলরাশিও উপভোগ করতে পারেন দর্শনার্থীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা রশীদ মিয়া বলেন, শুনেছি, হাজার বছর আগে এদিক দিয়ে নদী ছিল। একসময় এটি খরস্রোতা নদী ছিল, জাহাজও চলাচল করত। পরে নদীটি ভরাট হয়ে অস্তিত্ব হারিয়েছে। কয়েক বছর ধরে এখানে লাল শাপলা ফুটতে দেখা যাচ্ছে। এবার তুলনামূলক বেশি ফুটেছে। অনেক মানুষ শাপলা দেখতে আসছেন। কেউ যেন ফুল না তোলে, সে বিষয়ে আমরা সবাইকে নিষেধ করব।

একই এলাকার বাসিন্দা আবদুল কদ্দুছ বলেন, ফজরের নামাজের পর অগণিত শাপলা ফুটে থাকতে দেখতে খুব ভালো লাগে। ফুলগুলো আমাদের এলাকার সৌন্দর্য। সবাই সচেতন থাকলে এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সাংবাদিক ছাইদুর রহমান নাঈম বলেন, কিশোরগঞ্জে লাল শাপলা তেমন একটা দেখা যায় না। মসূয়ার এই শাপলার সৌন্দর্য রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি স্থানীয় পর্যটনের নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে। এতে দর্শনার্থী বাড়ার পাশাপাশি সচল হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতিও।

কটিয়াদী সরকারি কলেজের পরিবেশ, প্রকৃতি ও উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা হলেও একসময় দেশের বিল-ঝিল, খাল-বিল ও জলাশয়ে বিভিন্ন প্রজাতির শাপলা-পদ্মের সমারোহ ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাট এবং অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের কারণে এসব জলজ উদ্ভিদের বিস্তৃতি কমছে। জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রকৃতির এই সৌন্দর্য যে শুধু চোখ জুড়ায় তা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জীবনও। তাই শাপলা সংরক্ষণে প্রয়োজন স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি প্রশাসনিক উদ্যোগ।

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, পরিবেশ ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক শাপলা টিকিয়ে রাখতে প্রশাসন কাজ করবে। এর সংরক্ষণ ও বিস্তারের বিষয়টি দেখা হবে।

তিনি জানান, সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ির অতিথিশালা বর্তমানে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে এবং আগত পর্যটকেরা এটি ব্যবহার করতে পারবেন।

সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/এএমকে