পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বায়েক) পাইওনিয়ার বেইজে অগ্নিকাণ্ডের পর এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও পানি সরবরাহ। এতে প্রকল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগুন লাগার পর থেকে পাইওনিয়ার বেইজ ভবনটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ ভবনসহ কয়েকটি স্থাপনায় এখনো বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট সরবরাহ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসকক্ষে বসা, নিয়মিত কাজ করা এবং ওয়াশরুম ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন।
বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই—পাইওনিয়ার বেইজ, ক্যান্টিন, কাস্টমস ভবন ও বায়েকের মসজিদে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে পাইওনিয়ার বেইজ, কাস্টমস বিল্ডিং, ১.৬ বিল্ডিং, ট্রেনিং সেন্টার ও মেডিকেল সেন্টারে। পাইওনিয়ার বেইজ, কাস্টমস ভবন ও ক্যান্টিনে খাবার পানি এবং ওয়াশরুমের পানির সরবরাহও নেই বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া মসজিদে পানি না থাকায় মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে পারছেন না। বিদ্যুৎ না থাকায় ক্যান্টিনে খাবার রান্না বন্ধ, এতে কর্মকর্তাদের বাইরে হোটেলে খেতে গিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট ও পানির কোনো সরবরাহ নেই, এতে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ক্যান্টিনে আজ দুই দিন ধরে খাবার সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বাইরের হোটেলে খাওয়া অনেক রিস্কের ব্যাপার। খাবারের মান ও পরিবেশগত সমস্যা। এ ছাড়া মসজিদে ওজু করার পানি না থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বায়েকের বিভিন্ন অফিসে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় দাপ্তরিক কাজের গতি অনেকাংশে কমে গেছে। বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে কাজের গতি আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশা করছেন তারা।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. আবুল হাশেম বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে আগুনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ সার্ভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ হিসেবে অফিসের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে (এসি) বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে রূপপুর কর্তৃপক্ষ।
স্টেশন অফিসার হাশেম জানান, এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট অফিসের ইনচার্জ মো. রুহুল কুদ্দুস বলেন, আগুনে কিছু নথিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে প্রতিটি ফাইলের ব্যাকআপ কপি সংরক্ষিত থাকায় বিষয়টি গুরুতর নয়।
তিনি জানান, সার্ভার স্টেশনে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হওয়ায় গত দুই দিন ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সেবা স্বাভাবিক করতে কাজ চলছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) কেন্দ্রটি পরিদর্শনের সময় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ফায়ার স্টেশন এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল থাকা প্রয়োজন। তবে রূপপুরে বর্তমানে ৪৯ জন কর্মী নিয়ে একটি সাধারণ মানের ফায়ার স্টেশন পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্টেশন অফিসার মো. আবুল হাশেম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে কর্তৃপক্ষ নিজস্ব প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ করবে। বিশেষায়িত জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ কর্মীরাই দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি আরও বলেন, ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পার্শ্ববর্তী ফায়ার স্টেশনগুলোর সহায়তাও নেওয়া সম্ভব। তবে রূপপুর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ফায়ার স্টেশনের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রটির সক্ষমতা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বায়েক) চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বারবার ফোন কেটে দেন। এজন্য তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এএমকে
