পঞ্চগড় শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া করতোয়া নদী। নদীর পানি ঠেকাতে নির্মিত রক্ষাবাঁধটি এখন আর আগের মতো নেই। কোথাও বাঁধের জায়গা দখল করে উঠেছে তিনতলা ভবন, কোথাও সেমিপাকা ঘর ও দোকান। কেউ আবার বাঁধের ব্লক সরিয়ে বালু ভরাট করে তৈরি করছেন বাড়ি। নদীর পাড় ঘেঁষে আরসিসি পিলার বসিয়ে ইটের সীমানাপ্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে। ফাঁকা জায়গায় লাগানো হয়েছে মেহগনিসহ বিভিন্ন গাছের চারা।
পঞ্চগড় পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাজনগড় সিনেমা হল এলাকা থেকে রাজনগড় খালপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে করতোয়া নদীর রক্ষাবাঁধ ও নদীর জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এভাবে নদীর জায়গা দখল হতে থাকলে একদিকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে নষ্ট হবে নদীর পাড়ের পরিবেশ। দ্রুত এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে করতোয়ার পাড় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তাদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজনগড় সিনেমা হল এলাকা থেকে খালপাড়ার দিকে যেতে নদীর রক্ষাবাঁধের বিভিন্ন অংশে বসতঘর, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও বাঁধের অংশ দখল করে বাথরুম তৈরি করা হয়েছে। আবার কোথাও বাঁধের ব্লক সরিয়ে বালু ফেলে জায়গা উঁচু করা হয়েছে। নদীর পাড় ঘেঁষে আরসিসি পিলার দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি গাছ লাগানোর ঘটনাও দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এসব স্থাপনা এক দিনে তৈরি হয়নি। ধীরে ধীরে বাঁধের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো শুরুতেই ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।
নদীর রক্ষাবাঁধ দখলের অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের একজন প্রবাসী ফিরোজ আহাম্মেদ। তার দাবি, তিনি ২ শতক ১০ পয়েন্ট জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করছেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিজের কেনা জমির বাইরে নদীর আরও দুই শতকের বেশি জায়গা তিনি দখল করেছেন। সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নদীর ব্লক সরিয়ে বালু ভরাটের কাজও চলছে বলে অভিযোগ তাদের। নদীর পাড় ঘেঁষে আরসিসি পিলার দিয়ে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং মেহগনি গাছের চারা লাগানোরও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ফিরোজ আহাম্মেদ বলেন, আপনারা যা দেখেছেন, ভুল দেখেছেন। নদীর জায়গা দখল করিনি। সেখানে একটি গাইড ওয়াল দেওয়া হয়েছে, যাতে পানিতে বাড়ির কোনো ক্ষতি না হয়। পৌরসভার লোকজন এসে সব দেখে গেছে। আমি যে জায়গাটুকু বাড়তি করেছি, সরকারের যখন প্রয়োজন হবে, তখন ভেঙে দেব।
আরেক দখলকারী শহীদুল ইসলাম বলেন, যে জায়গায় বাড়ি করে আছি, সেখানে জায়গা হচ্ছে না। এ কারণে ভাবলাম, ওদিকে তো জায়গা ফাঁকা আছে। তাই একটু জায়গায় বাথরুম করেছি। সরকার যদি জায়গা নিয়ে নেয়, তাহলে আমাদের করার কিছু নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর জায়গায় দোকান ও সেমিপাকা ঘর নির্মাণের পাশাপাশি বহুতল ভবনের নকশাও অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এতে দখলদারেরা আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে পৌরসভা বলছে, নকশা অনুমোদন ও নির্মাণের কাগজপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম ইরান বলেন, রাজনগড় সিনেমা হল থেকে খালপাড়া পর্যন্ত মানুষ নদীর জমি দখল করে নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে। পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে তারা কেন চুপ করে আছেন?
পঞ্চগড় পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রণব সাহা বলেন, কেউ নদীর জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করে থাকলে লোক পাঠিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। এরপর ভবনের নকশা অনুমোদনের কাগজপত্রসহ অন্যান্য নথি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মন বলেন, নদী দখলের একটি তালিকা করা হচ্ছে। কেউ নদীর জায়গা দখল করে থাকলে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নুর হাসান/আরকে
