এক সময় সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই বদলে যেত দৃশ্যপট। দিনের ব্যস্ততা হঠাৎ থেমে যেত। সড়কে কমে আসত মানুষের চলাচল, একে একে বন্ধ হয়ে যেত দোকানের ঝাঁপ। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই পথচারীরা নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করতেন। আর ব্যবসায়ীরা দোকান গুটিয়ে বাড়ির পথ ধরতেন। কারণ পীরগঞ্জ-ঠাকুরগাঁও আঞ্চলিক মহাসড়কের ভাতার মারি রেলক্রসিং এলাকা একসময় পরিচিত ছিল ডাকাত ও ছিনতাইকারীদের স্থান হিসেবে।
পথে চলতে গিয়ে মানুষকে থামিয়ে ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হতো এমন অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। সন্ধ্যার পর ওই পথে চলাচল করাটাই অনেকের কাছে ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের মতে, কখনো কখনো ডাকাতির ঘটনায় প্রাণহানি ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সেই ভাতার মারিই এখন পেতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয়। যেখানে একসময় সন্ধ্যা নামলেই মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হতো, সেখানেই গড়ে উঠছে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) পীরগঞ্জ-ঠাকুরগাঁও সড়কের ভাতার মারি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
রাষ্ট্রপতির হাত ধরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে এলাকাটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের ভয়-শঙ্কার জায়গায় এখন জায়গা করে নিয়েছে নতুন প্রত্যাশা। তাদের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হলে শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগই তৈরি হবে না, বদলে যাবে পুরো এলাকার চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে প্রাথমিক প্রস্তুতি। জমি অধিগ্রহণ, প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ অবকাঠামোগত প্রস্তুতির বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাতার মারি রেলক্রসিং এলাকা কয়েক দশক ধরেই অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে দুর্নাম কুড়িয়েছিল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে ভয় পেতেন অনেকেই। দূরপাল্লার যাত্রী, স্থানীয় ব্যবসায়ী কিংবা মোটরসাইকেল আরোহী সবাই চেষ্টা করতেন দিনের আলো থাকতে এই এলাকা পার হতে।
মহেষালী গ্রামের ৭০ বছর বয়সী মজিবর রহমান বলেন, সন্ধ্যা হলেই মানুষ এই রাস্তা এড়িয়ে চলত। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাট একেবারে ফাঁকা হয়ে যেত। ডাকাতের ভয়ে মানুষ প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হতো না। অনেককে পথ আটকে সর্বস্ব নিয়ে নেওয়া হয়েছে। কারও কারও জীবনও গেছে।
মজিবর রহমানের মতো প্রবীণদের কাছে বর্তমান দৃশ্য যেন বিশ্বাস করার মতো নয়। যে এলাকায় রাত নামার আগেই মানুষের চলাচল কমে যেত, সেখানে এখন বড় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে ওঠার প্রস্তুতি চলছে।
ভাতার মারির পুরোনো বাসিন্দাদের কাছে এলাকার পরিবর্তনের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যবসায়ীদেরও নানা স্মৃতি। এলাকায় প্রথম দিকের চায়ের দোকান দেওয়া ৪৫ বছর বয়সী মর্জিনা বেগম বলেন, একসময় সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দোকান বন্ধ করে দিতে হতো। দোকানে বসে থাকার চেয়ে দ্রুত মালামাল গুছিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফেরাটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আগে সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখার সাহস পেতাম না। কখন কী হয়, সেই ভয় ছিল। এখন এখানে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এটা শুনে ভালো লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে মানুষের চলাচল বাড়বে। তখন আমরাও নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারব।
শুধু মর্জিনা বেগম নন, এলাকার অনেক ব্যবসায়ীই মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়বে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ঘিরে নতুন দোকান, খাবারের হোটেল, বাসাবাড়ি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে। ফলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতিও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. ইসরাফিল শাহীন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরুর লক্ষ্য সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে। একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হলে ভাতার মারি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক মানুষের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে শুধু ক্যাম্পাস নয়, এর আশপাশের এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অতীতে এলাকাটির যে নেতিবাচক পরিচিতি ছিল, সেটি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোদাদাদ হোসেন বলেন, বর্তমানে ভাতার মারি এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
রেদওয়ান মিলন/আরকে
