বিজ্ঞাপন

লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত এশামনি বাঁচতে চায়

লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত এশামনি বাঁচতে চায়

এগারো বছরের এশামনি জটিল লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। চার দেওয়ালেই আটকে আছে তার জীবন। একটু হাঁটলেই শ্বাসকষ্টে হাঁফিয়ে ওঠে সে। ঠিকমতো খেতেও পারে না। তাকে বাঁচাতে ব্যয়বহুল লিভার অ্যালবুমিন ইনজেকশন বা ইনফিউশন পুশ করা হচ্ছে। গত ৪ মাস থেকে তার স্বাভাবিক জীবন এখন সূক্ষ্ম সুতোয় আটকে আছে। 

ব্যয়বহুল ও জটিল এই চিকিৎসায় লিভার প্রতিস্থাপনে দরকার প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। কাঁচামাল ব্যবসায়ী বাবার পক্ষে বর্তমান চিকিৎসা ব্যয় মেটানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে এই বিশাল অঙ্কের টাকা কোথায় পাবেন তারা। ফলে অর্থের অভাবে এশামনির বেঁচে থাকাটাই এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই শিশুটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে।

কুড়িগ্রাম পৌর শহরের রেজিস্ট্রিপাড়ায় শিশু নিকেতন স্কুলের দক্ষিণের দেওয়ালের পাশে স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন কাঁচামাল ব্যবসায়ী ইব্রাহিম আহম্মেদ। বড় মেয়ে এশামনি (১১) পিটিআই স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ে ইফতি আক্তারের বয়স ৫ বছর। দুই মেয়েকে নিয়ে তার স্বপ্ন— সন্তানদের শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড় করাবেন। কিন্তু চার মাস আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পর এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন ইব্রাহিম ও তার স্ত্রী মারুফা।

এশামনির মা মারুফা ইয়াসমিন বলেন, চার মাস আগে পিটিআই স্কুল থেকে শিক্ষকরা আমার বাসায় পিয়ন পাঠিয়ে জানালেন, এশামনি ক্লাসে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। আমরা দ্রুত স্কুলে গিয়ে অচেতন মেয়েকে প্রথমে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নিয়ে আসি। সেখানে চিকিৎসকরা ভর্তি না করায় অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করাই। এর মধ্যেই আমার মেয়ের পা, মুখ, মাথা ও পেটে পানি জমে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। মেয়ে আমার কথা বলতে পারছে না। হাসপাতালে টানা ১৬ দিন আমাদের থাকতে হয়েছে। সেখানে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে আমার সন্তান লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছে। 

তিনি বলেন, রোগটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আস্তে আস্তে যখন জানতে পারলাম তখন আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আমার প্রথম সন্তান। আমার প্রথম মা ডাক শোনা। এমন ফুটফুটে সুন্দর একটা মেয়ে কিনা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ছটফট করছিলাম। ভাবছিলাম কীভাবে এর চিকিৎসা করাবো। ওর বাবা কাঁচামালের ব্যবসার জন্য একটা দোকান বরাদ্দ নিয়েছিল, সেটি ছাড়িয়ে নেওয়া হলো। সেই টাকা দিয়েই চিকিৎসা ব্যয় মেটানো হলো। এতেই প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হলো। ওর একটা ইনজেকশন নিতে খরচ লাগে প্রায় ১০ হাজার টাকা। আমরা এত টাকা কোথায় পাবো। 

এশামনির বাবা ইব্রাহিম বলেন, অসুস্থ হলেই তাকে উচ্চমূল্যের অ্যালবুমিন প্রোটিন ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়। এই ইনজেকশন নাকি তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। এখন তার খাওয়া-দাওয়া ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম অবস্থা। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, ভারত কিংবা সিঙ্গাপুর ছাড়া দেশে এর ভালো কোনো চিকিৎসা নেই। ভারতের হায়দরাবাদে চিকিৎসা করাতে গেলে তার লিভার কেটে ফেলে তার মায়ের বা আমার লিভার প্রতিস্থাপন করলে সে কিছুটা ভালো থাকবে। এ ছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই। আমি গরিব কাঁচামালের দোকানদার। জমিজমা নেই। ভাড়া বাসায় থাকি। এখন নিজেরা খাব কী, মেয়ের চিকিৎসা করাব কীভাবে।

এশামনির দাদি বেবা বেগম বলেন, আমার নাতনি ছোটবেলা থেকেই অসুস্থ। চার মাস আগে জানা গেল তার কঠিন রোগ হয়েছে। কিছুদিন পরপর আমার নাতনিটার পেট, পা, মুখ ও মাথায় পানি জমে। সারাক্ষণ মাথাব্যথা করে। শ্বাসকষ্ট হয়। পাতলা পায়খানা করে। সারা রাত ঘুমাতে পারে না। ফুটফুটে নাতনিটার দিকে তাকালে খুব কষ্ট হয়।

প্রতিবেশী আনজুম আরা বলেন, মেয়েটি ছোট থেকেই অসুস্থ। সে লেখাপড়ায় অনেক ভালো। অসুস্থ হওয়ার কারণে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। বাবা-মা দারিদ্র্যের কারণে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। তার চিকিৎসায় সহযোগিতা করা হলে সে আবার সুস্থ হয়ে স্কুলে যেতে পারত।

এশামনির দাদা মোসাবের বলেন, আমার ছেলের পক্ষে নাতনির চিকিৎসা ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে মেয়েটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে।

এশামনি বলে, আমি খেতে পারি না, খেলে খারাপ লাগে। হাত-পা ব্যথা করে, বমি লাগে। শরীর ভারী লাগে, বসলে উঠতে পারি না। একটুতেই ক্লান্ত হয়ে যাই। হাঁফিয়ে উঠি।

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের সাবেক সিভিল সার্জন ডা. এস এম আমিনুল ইসলাম বলেন, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি জটিল রোগ। তাকে দ্রুততম উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের হায়দরাবাদে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া দরকার। একমাত্র লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমেই হয়তো তাকে চিকিৎসা করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ জন্য সব মিলিয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকার প্রয়োজন।

মমিনুল ইসলাম বাবু/আরএআর

বিজ্ঞাপন