বিজ্ঞাপন

পিরোজপুরে বাড়ছে ডেঙ্গু, হাসপাতালে রোগীর চাপ

পিরোজপুরে বাড়ছে ডেঙ্গু, হাসপাতালে রোগীর চাপ

পিরোজপুরে চলতি বছর ২ হাজার ৮৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে যা বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষে। পার্শ্ববর্তী জেলা ঝালকাঠি রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে জেলায় একজন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৯৯২ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৫০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৯৩ জন। এর মধ্যে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ১৮ জন, নেছারাবাদে ১২ জন, ভান্ডারিয়ায় ১১ জন, কাউখালীতে ৪ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে ইন্দুরকানীতে ও নাজিরপুরে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী নেই। পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকা ৩১ শতাংশ রোগীই পার্শ্ববর্তী জেলা বাগেরহাট, ঝালকাঠি এবং গোপালগঞ্জ জেলায় থেকে ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে বেশিরভাগই বাগেরহাট জেলার বাদাল এলাকার।

গত ৯ মাসের হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৯২৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এছাড়াও ভান্ডারিয়ায় ৪০০ জন, নেছারাবাদে ৩৭১, কাউখালীতে ১৪০, নাজিরপুরে ১৫০ এবং মঠবাড়িয়ায় ৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

সরেজমিনে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষের পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ১৮ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের একই কক্ষে রাখার চিত্রও দেখা গেছে।

ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও অনেক রোগী নিয়মিত মশারি ব্যবহার করছেন না। এতে অন্য রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী মোসা. ফারজানা নাসরিন বলেন, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে হাসপাতালের এক দরজা থেকে অন্য দরজা পর্যন্ত মেঝেতে রোগীরা শুয়ে আছেন। পাশের রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও অনেক সময় মশারি টানানো হয় না। বিদ্যুৎ চলে গেলে অতিরিক্ত গরমের কারণে ডেঙ্গু রোগীরাও মশারি খুলে রাখেন। এতে অন্য রোগীদেরও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা কর্নার এবং সাধারণ রোগীদের আলাদাভাবে রাখার ব্যবস্থা করা হলে ভালো হতো।

হাসপাতালের কর্মীরা জানান, ডেঙ্গু রোগীদের নিয়মিত মশারি ব্যবহারের জন্য বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই কিছুক্ষণ মশারি টানিয়ে রাখার পর আবার খুলে ফেলেন।

মশারি না টানিয়ে রাখার বিষয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর মা আদরী খানম বলেন, আমার ভুল হয়েছে। চিন্তা করেছিলাম সন্ধ্যা হলে মশারি টানাবো। 

তিনি জানান, তার ছেলে আগের তুলনায় এখন মোটামুটি সুস্থ রয়েছে এবং হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গু রোগীর চাপের পাশাপাশি পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটও প্রকট। হাসপাতালটিতে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত ৬২টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪৪টি পদই শূন্য রয়েছে। স্টাফ সংকটও রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল কনসালট্যান্ট সুরঞ্জিত সাহা বলেন, চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপও কমছে না। একজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। এর মধ্যে নতুন রোগী আসছে, পাশাপাশি অন্যান্য রোগীও ভর্তি হচ্ছেন। ফলে হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বেশি।

তিনি বলেন, আগে পাশের জেলা বাগেরহাটের বাদাল এলাকা থেকে বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হতেন। বর্তমানে পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার নিজাম উদ্দিন বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ১৫ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ১০০ শয্যার বিপরীতে ৩০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় জায়গা ও চিকিৎসক দুই সংকটেই চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নতুন হাসপাতাল ভবনের নিচতলায় ইতোমধ্যে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফার্নিচারের প্রায় সবই এসেছে। প্রয়োজনীয় কিছু জনবল পাওয়া গেলে পুরো ভবনে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। তখন হাসপাতালের জায়গা সংকট অনেকটাই কমে আসবে।

এদিকে পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (আইইডিসিআর)-এর একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, আইইডিসিআরের অনুসন্ধানে জেলার বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সুপারি ও নারিকেল গাছ কাটার পর গোড়ায় জমে থাকা পানি, নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় নালা এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও বাড়িঘরের আশপাশ, খেলার মাঠ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে থাকার চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যায়, আবার কোথাও মানুষের অসচেতনতার কারণে পানি জমে রয়েছে। নারিকেলের খোসা ও গাছের টবেও জমে থাকা পানির দেখা মিলেছে।

পিরোজপুর পৌরসভার বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, পৌর এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা যেমন দুর্বল, তেমনি মানুষের অসচেতনতাও রয়েছে। বাড়ির আশপাশ, ফুলের টব ও খেলার মাঠে পানি জমে থাকছে। এসব জায়গায় এডিস মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। মানুষ সচেতন না হলে এবং মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার না করা হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

পিরোজপুর পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, মশার লার্ভা ধ্বংস করতে শহরের নালা ও ড্রেনগুলোতে নিয়মিত মশকবিরোধী স্প্রে করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচারও চালানো হচ্ছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন করে মাসব্যাপী মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পিরোজপুর জেলা পরিষদ। ইতোমধ্যে ছয়টি ফগার মেশিন কেনা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জেলা পরিষদের প্রশাসক আলমগীর হোসেন বলেন, পিরোজপুরকে ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা উদ্বেগের বিষয়। ডেঙ্গু একটি প্রাণঘাতী রোগ। এটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের অন্যান্য দপ্তরের পাশাপাশি জেলা পরিষদও শুরু থেকেই কাজ করছে।

তিনি বলেন, মশক নিধনের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা ও লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় জেলা পরিষদ আরও তৎপর হয়েছে। ছয়টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে মাসব্যাপী জেলার বিভিন্ন এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও লিফলেট বিতরণ অব্যাহত থাকবে।

জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচিও চলবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এই তিন মাসে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বাড়াতে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসব্যাপী দেশজুড়ে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ পরিচালনা করবে সরকার।

আরএআর