নরসিংদীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে পৌর শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডগুলোতে কোনো সিট খালি নেই। জায়গা না থাকায় ওয়ার্ডের মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে যে পরিমাণ নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত শয্যা ও জনবল হাসপাতালে নেই।
নরসিংদী সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার নরসিংদীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে ৮৮ জন। এর মধ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ১৮ জন, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ৩০ জন, মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ জন, পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন, শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ জন ও রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত বৃহস্পতিবার নতুন শনাক্ত হয়েছেন ২৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৮৮ জন। এর আগের দিন বুধবার নতুন শনাক্ত হয়েছেন ৪৩ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪১ জন এবং মোট ভর্তি ছিলেন ১০৪ জন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) শনাক্ত হন ২১ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ২৪ জন এবং মোট ভর্তি ছিলেন ১০২ জন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) শনাক্ত হয়েছিলেন ৩৭ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ৪১ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। গত রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) শনাক্ত হন ৩৫ জন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ৯ জন এবং মোট ভর্তিকৃত রোগী ছিলেন ১০৯ জন।
একদিকে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, অন্যদিকে চিকিৎসক ও নার্সদের তীব্র সংকট—সব মিলিয়ে জেলার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ল্যাবরেটরিতে রক্তের প্লাটিলেট ও সিবিসি টেস্ট করাতে দীর্ঘ লাইন পড়ে। ল্যাব কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
রায়পুরা উপজেলার আমিরগন্জ গ্রামের সোহেল নামে এক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী জানান, তিনি জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিন দিন হয়। শরীরে জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালে আসেন। ডাক্তার তাকে দেখে পরীক্ষা দেন এবং হাসপাতালে ভর্তি রাখেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সব পরীক্ষা ও ওষুধ হাসপাতাল থেকেই বিনামূল্যে পাচ্ছেন বলে জানান।
নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের ল্যাব টেকনেশিয়ান শাহ আলম মিয়া বলেন, আগে যেখানে দৈনিক ৫০/৬০জন রোগীর পরীক্ষা করা হতো, সেখানে বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০/১৬০ জন রোগীর পরীক্ষা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ রোগীর মাঝে ডেঙ্গুর নমুনা পাওয়া যাচ্ছে।
নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফরিদা গুলশানারা কবির বলেন, শয্যা সংকটের কারণে আমরা চাইলেও যেসব ডেঙ্গু রোগী ভর্তি দরকার, দিতে পারছি না। সে ক্ষেত্রে যাদেরকে বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব তাদের স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি এবং আমরা তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছি। এ ছাড়া রোগীর পরিবারের সদস্যদের বলে দেওয়া হচ্ছে যাতে রোগীর শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে জানান।
নরসিংদী ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান বলেন, যে হারে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে সামনে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এ ছাড়া হাসপাতালে আসা রোগীদের ৩০/৪০ ভাগ রোগী ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। এখনো হটস্পট হয়ে ওঠেনি, তবে ব্যপক আকারে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তেছে।
নরসিংদী সিভিল সার্জন ডা. মো. বুলবুল কবীর বলেন, জেলায় ডেঙ্গুর কিড পর্যন্ত রয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুর অবস্থা আগের থেকে উন্নত। গত সপ্তাহের চেয়ে এ সপ্তাহে তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত্রের সংখ্যা। তবে আবার বাড়তেও পারে। এ জন্য আমাদের যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আমাদের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। তবে যদি ডেঙ্গুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় নরসিংদী জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, জনসচেতনতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকে তার বাড়ির নিজ নিজ আঙিনা, ছাদ, বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
আমিনুর রহমান সাদী/এএমকে
