মাদকের টাকা জোগাড় করতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে চার পরিবারের পাঁচ শিশু সন্তানকে টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পৃথক সময়ে এসব শিশুকে ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্কের বিনিময়ে অন্যের হাতে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, শিশুদের কয়েকজনকে পরে আরও বেশি টাকায় অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে শিশুদের বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঘটনাগুলো ঘটেছে কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামটিতে মাদকের বিস্তার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শতাধিক নারী-পুরুষ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন বলেও দাবি তাদের। নেশার টাকা জোগাড় করতে কেউ কেউ সন্তানকে পর্যন্ত বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুলাল মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রী ফারজানার নবজাতক সন্তানকে গত ২ সেপ্টেম্বর ৬০ হাজার টাকায় দেওয়া হয়েছে। জজ মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর একজনকে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং অন্যজনকে ২০ হাজার টাকায় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
এছাড়া আসাদ মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন তার সন্তানকে ৭৭ হাজার টাকা এবং মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে আসাদ মিয়া তার সন্তানকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে অন্যের কাছে তুলে দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, শিশুদের যাদের কাছে প্রথমে দেওয়া হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ পরে অন্য ব্যক্তির কাছে আরও বেশি টাকায় শিশুদের তুলে দিয়েছেন। এতে শিশুদের প্রকৃত অবস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে তারা শঙ্কিত।
চরপুক্ষিয়া গ্রামের জয়নাল মিয়া, বকুল মিয়া, বাবুল মিয়া, জামাল মিয়া, কালাচান, সখিনা, কালুমিয়া, নুরুন্নাহার ও গ্রাম পুলিশ দুলাল মিয়াসহ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মাদকের কারণে গ্রামের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাইলেও তারা ভয় পান। তাদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলে হামলা, হয়রানি কিংবা তাদের সন্তানদেরও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, শুধু বড়রাই নন, শিশুদেরও মাদকের সংস্পর্শে আনা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে মাদক সেবন করানোর অভিযোগও করেন তারা। কোনো কোনো বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানরা একসঙ্গে মাদক সেবন করেন বলেও দাবি তাদের।
গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের সন্তানরাও ছোট। মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই। কিন্তু প্রতিবাদ করলে আমাদের সন্তানদেরও নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার ভয় আছে।
এদিকে উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার অভিযোগ করেছে কটিয়াদী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। ওই শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের গ্রামের নাম বললেই অনেকে টিটকারি করে বলে, তোরা মাদকাসক্ত। তোদের গ্রামের মানুষ মাদকের টাকা জোগাড় করতে ছেলে-মেয়ে বিক্রি করে। এসব কথা শুনে অনেকেই আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না। আমরা সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশে বাঁচতে চাই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কটিয়াদী মডেল থানার মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত গ্রামটিতে মাদকের এমন বিস্তার ঘটলেও তা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তারা দ্রুত মাদকবিরোধী অভিযান, মাদকসেবী ও কারবারিদের শনাক্তকরণ এবং শিশু বিক্রির অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে শিশু বিক্রির অভিযোগ ওঠা পরিবারগুলোর সদস্যরা সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জালালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে মাদকের ছোবল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। মাদক সেবনের টাকার জন্য বিভিন্ন সময়ে পাঁচটি শিশু সন্তান বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনেছি। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক ও প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজ করব।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, উত্তর চরপুক্ষিয়া গ্রামে দারিদ্র্যতা ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে সন্তানদের টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছি। মাদক নির্মূলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সাখাওয়াত হোসেন হৃদয়/এমএন
