কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুইটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে সড়ক ও আবাদি জমি। বাড়ির রান্নার জায়গা ও চলাচলের পথ তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এই চরাঞ্চলের মানুষ। প্লাবনের কারণে বাড়িঘরের আশপাশে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষের।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) উপজেলার সীমান্তবর্তী রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন ও চিলমারী ইউনিয়নে অতিরিক্ত পানি প্রবেশ করলে এসব ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ফারাক্কা হয়ে নেমে আসা উজানের ঢলে গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে পদ্মা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার করে পানি বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি প্রায় ৮৮ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ১৩.০২ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৩.৮০ মিটার। অর্থাৎ বর্তমানে বিপৎসীমার মাত্র ০.৭৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পদ্মার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দৌলতপুরের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) থেকে উজানের ঢল ও বৃষ্টিপাতের ফলে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দৌলতপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে সীমান্তবর্তী এই ইউনিয়ন দুটির বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির জন্য দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়ন ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। এতে মূল ভূ-খণ্ডের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দুই ইউনিয়নের ৫০ হাজারের বেশি মানুষ।
পানি বৃদ্ধিতে চরাঞ্চলের সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। নৌকা ও ডিঙ্গি নৌকায় যাতায়াত করছেন এই এলাকার মানুষ। অনেক পরিবারের রান্নার জায়গা পানিতে তলিয়ে গেছে। বসতবাড়িতে পানি যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি গবাদিপশুর নিরাপত্তা, গো-খাদ্য নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন দুর্গত এলাকার মানুষ।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হঠাৎ পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম ও ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলের ঘর বাড়িতে পানির উঠে গেছে। এভাবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং বন্যা দীর্ঘায়িত হলে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও গো-খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে।
রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের চারপাশে এখন পানি। সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও ভিটা পর্যন্ত পানি উঠে এসেছে। পানির দুর্ভোগের পাশাপাশি সাপের আতঙ্কেও মানুষ দিশেহারা।

বন্যার পানি ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার ফসলি জমিতে ঢুকে পড়েছে। এতে রোপা আমন ধান, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৩৫০ হেক্টর ফসলি জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও কৃষি পরামর্শ দেওয়া হবে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুশতাক আহম্মেদ বলেন, পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও নিরাপত্তায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা না দেওয়া হলেও বন্যাকবলিত এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে শ্রেণি পাঠদান স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে, বিদ্যালয় ভবনগুলো খোলা থাকবে যাতে বন্যায় গৃহহীন মানুষ সেখানে নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে চিলমারী ইউনিয়নের অসহায় ও দুস্থ ২৫০-৩০০ পরিবারের মধ্যে সীমিত পরিসরে খাদ্যসামগ্রী ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হবে।
রবিউল আলম ইভান/এসএইচএ
