ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় প্রায় ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পানিবন্দি এলাকাগুলোতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপও দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে আমবাগানসহ বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর ও আলাতুলি ইউনিয়নের ১ হাজার ৮০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের ১ হাজার ১০০ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নে ১২টি এবং শিবগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ১৭টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, উজানের ঢল ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে মোট ১৩০ দশমিক ৪০ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফসলের মধ্যে রয়েছে রোপা আমন, আউশ, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা, কলা, হলুদসহ অন্যান্য ফসল।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পদ্মা নদীর পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২১ দশমিক ৭৯ মিটার। নদীর বিপৎসীমা ২২ দশমিক শূন্য ৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ২৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। এছাড়া পদ্মার পাশাপাশি মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীতেও পানি বাড়ছে।
বর্তমানে মহানন্দা নদীর খালঘাট গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার। এ নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। অন্যদিকে পুনর্ভবা নদীর রহনপুর গেজ স্টেশনে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৫২ মিটারে। এ নদীর বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার।
স্থানীয় অধিবাসীরা জানান, পানির উৎসগুলো ডুবে যাওয়ায় প্লাবিত অঞ্চলে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। নিরাপদ পানি সংগ্রহ করতে দূরদূরান্তে যেতে হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি বেড়েছে। পাশাপাশি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এছাড়া পানিবাহিত রোগের প্রকোপও বেড়েছে।
আব্দুর রহিম বলেন, পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে আমাদের এলাকা ডুবে গেছে। পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন অনেক মানুষ। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে।
মুরশালিন নামের আরেকজন বলেন, পানিবন্দি অবস্থায় অনেক মানুষ দুর্বিষহ জীবন পার করছেন। সবকিছু ডুবে গেছে। রান্নাবান্না করতেও সমস্যা হচ্ছে। অনেকে উঁচু করে মাচা নির্মাণ করে রান্নার কাজ করছেন। সরকারের প্রতি আহ্বান, তারা যেন দ্রুত আমাদের পাশে দাঁড়ায়।

সাফিউল ইসলাম বলেন, বন্যায় ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে একদিকে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ বেড়ে গেছে। যারাই বন্যার পানিতে হাঁটাচলা করছেন, তাদের প্রত্যেকের শরীরে এখন চুলকানি দেখা দিচ্ছে।
সাফিউল ইসলাম বলেন, বন্যায় ঘরবাড়িতে পানি উঠে যাওয়ায় পানিবন্দি হয়ে একদিকে মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে এলাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা পানিবাহিত রোগ বেড়ে গেছে। যারা বন্যার পানিতে হাঁটাচলা করছেন, তাদের প্রত্যেকের শরীরে এখন চুলকানি দেখা দিচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রকিবুল ইসলাম বলেন, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী আগামীকাল (শনিবার) পর্যন্ত পদ্মার পানি বাড়তে পারে। এরপর পানি কমতে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন বলেন, পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আজ থেকে তাদের প্রত্যেকের কাছে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাজহারুল ইসলাম জানান, উপজেলার দুর্লভপুর, উজিরপুর ও পাঁকা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসহায়তা প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সব পানিবন্দি মানুষের কাছে এ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাহীন সুলতানা বলেন, সদর উপজেলায় ১২টি ও শিবগঞ্জ উপজেলায় ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ আছে। তবে অন্যত্র উঁচু স্থানে বিকল্প পাঠদানের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, উজানের পানির ঢলে ১৩০ দশমিক ৪০ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। যেসব রোপা আমন ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো কেটে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া দুই-এক দিনের মধ্যে পানি নেমে যাবে বলে আশা করছি। ফলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। এছাড়া কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় যাতে ডায়রিয়া ও কলেরার প্রকোপ মহামারি আকারে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন ও কলেরার স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। চর্মরোগে আক্রান্তদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে সেবা নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এছাড়া সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে।
মো. আশিক আলী/এমএমবি
