পদ্মার ভাঙনে যখন বিলীন হওয়ার পথে জন্মভূমি, তখন আর দূরদেশে বসে থাকতে পারেননি আমেরিকা প্রবাসী ইমরান মিয়া। পৈতৃক ভিটাসহ বানারী গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসতি রক্ষায় ছুটে এসেছেন দেশে। নিজের সঞ্চয়ের প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে নদীতীরে নির্মাণ করছেন অস্থায়ী বাঁধ। তার এই উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও। তবে স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী নয়, পদ্মার ভয়াল ভাঙন থেকে পুরো জনপদ রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
আমেরিকান প্রবাসী ইমরান মিয়া মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বানারী গ্রামের সন্তান। ১৯৯০ সালে পদ্মা গ্রাস করে নিয়েছিল তার পৈতৃক ভিটা। ৫ বছর পর সেই পদ্মার বুকেই আবার জেগে ওঠে চর। প্রায় ২০ বছর আগে সেই চরেই আবার বসতি গড়েন ইমরান।
সেখানেই গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক এক পার্কের আদলে বাড়ি। দুই পাশে পদ্মা, মাঝে তার স্বপ্নের বাড়ি। সেখানে ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি পালতেন। পার্কটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন টিকিট ছাড়াই। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতো, ঘুরতো এবং পিকনিক স্পট হিসেবে স্থানের পরিচিতও ছিল বেশ। প্রতিবছর আমেরিকা থেকে এসে স্ত্রীকে নিয়ে এখানেই থাকতেন তিনি। কিন্তু গত ১০ দিনে পদ্মার ভয়াল ভাঙন সব শেষ করে দেওয়ার উপক্রম। মুহূর্তে ঝুঁকিতে পড়ে ইমরান মিয়ার বাড়িসহ পুরো বানারী গ্রাম। গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আর দেরি করেননি। নিজের অর্থায়নেই শুরু করেন ভাঙনরোধে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ। তার এই উদ্যোগ দেখে পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডও।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিয়া বাড়ির বেশ কিছু অংশ এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে দিন-রাত চলছে বালুর বস্তা ফেলার কাজ।

ইমরান মিয়া বলেন, আমাদের পৈতৃক ভিটাটি ৯০ সালে পদ্মায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৫ বছর পর আবার জেগে উঠে চর। চর উঠার পরে দু-পাশেই পদ্মা নদী কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল। নদী পার হয়ে ২০০ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে বাড়িতে আসতাম। এখন বাড়ির গোড়ায় নদী। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু এখানে ১০ হাজার পরিবার। তাদের বাঁচাতে হলে সরকারিভাবে স্থায়ী বাঁধ চাই।
স্থানীয়রা বলেন, বানারী গ্রামে রয়েছে বানারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গুচ্ছগ্রাম ও একাধিক মসজিদ। এর পাশে বিধুয়াইল, নগর, জোয়ার পাশেই ফরিদপুরের জাজিরা ইউনিয়ন। টঙ্গীবাড়ী ও জাজিরা মিলিয়ে এই অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের বসবাস।
বানারী গ্রামের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, আমাদের গ্রামে কয়েকটি মসজিদ, গুচ্ছগ্রাম, স্কুল আছে। আগে পদ্মা এখানে ছিল না। অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে এখানে চলে আসছে।
আরেক বাসিন্দা তাজুল ইসলাম বলেন, কয়েক বছর আগেও নদী অনেক দূরে ছিল। অল্প অল্প করে ভাঙতে ভাঙতে এখন বাড়ির কাছে। অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। এ বছর বর্ষার শুরু থেকেই ভাঙন তীব্র। যদি দ্রুত বালুর বস্তা না ফেলা হয় তাহলে সব শেষ হয়ে যাবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, অস্থায়ী বাঁধ নয়, পুরো গ্রাম রক্ষায় স্থায়ী ব্লক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তা নাহলে যেকোনো সময় নদীতে তলিয়ে যাবে স্কুল, মসজিদ, গুচ্ছগ্রামসহ পুরো জনপদ।
এই ভাঙনরোধে শুধু ইমরান মিয়া একা নন, পাশে দাঁড়িয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবোর মাঠ কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এখানে ভাঙন চলছে। আগেও আমরা বালুর বস্তা ফেলেছিলাম, কিন্তু স্রোতে সরে গেছে। এখন ব্যক্তি উদ্যোগে ইমরান মিয়া বাঁধ দিচ্ছেন, পাশাপাশি আমরাও কাজ করছি।
এদিকে শুধু বানারী গ্রামে নয়, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মুন্সীগঞ্জ সংলগ্ন পদ্মা নদীতে তীব্র স্রোতে ভাঙন দেখা দিয়েছে সদর উপজেলার শিলই, রাকির কান্দিসহ নদীতীরের কয়েকটি এলাকায়। বাড়ছে ধলেশ্বরী নদীসহ মেঘনার পানিও।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, জেলার নদীগুলোতে পানির স্তর বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। তবে এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে পানি। সরেজমিনে পদ্মা নদী পাড়ের টঙ্গিবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীতে পানির তীব্র প্রবাহ। ভাঙনের কারণে নদীর স্রোতে চলাচল করতে বেগ পেতে হচ্ছে ছোট নৌযানগুলোকে। স্থানীয় কয়েকজন জানান, গত দুই দিন ধরে বেড়েছে স্রোতের তীব্রতা।
স্থানীয় ট্রলার চালক শহিদুল বলেন, কয়েকদিন যাবৎ নদীতে তীব্র স্রোত। পানি বাড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে আমরাও ভাঙন-আতঙ্কে আছি।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, উজান থেকে পদ্মা দিয়ে পানি নামছে। নদীতে স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা ভাঙনরোধে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের গরিব দেশ। আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনও কম। তারপরেও নদী ভাঙার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ভাঙনরোধে আমাদের কাজ চলছে।
ব.ম শামীম/এসএইচএ
